সে এক রহস্যময় মন্দির। মন্দির আছে কিন্তু তাতে স্থায়ী বিগ্রহ নেই। শিবের মন্দির অথচ বছরের এগারো মাস শিবলিঙ্গ থাকে পুকুরে জলের তলায়। চৈত্র মাসের মাঝামাঝি কিছুদিনের জন্য তুলে আনা হয় শিবলিঙ্গ, পয়লা বৈশাখের দিন ফের তা চলে যায় জলের তলায় । আর এই শিবলিঙ্গকে কেন্দ্র করে বসে জমজমাট চড়কের মেলা। প্রায় সারাবছরই শিবলিঙ্গ জলের তলায় থাকে বলে মহাদিদেব এখানে পরিচিত জলেশ্বর শিব নামে। কথিত আছে, জলেশ্বর শিব মন্দিরটি (Jaleshwar Shiv Mandir) ৮৫০ বছরের পুরানো। উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটার জলেশ্বরে রয়েছে প্রাচীন এই শিব মন্দির।
“জলেশ্বর শিব” নামে অনেক মন্দির আছে। ওড়িশা কিংবা শান্তিপুরে এ নামের মন্দির আছে। কিন্তু জলের নিচে প্রায় সারাবছর বিগ্রহ থাকার মত ঘটনা বিরল। এহেন রহস্যময় মন্দির দেখতে ছুটে যাওয়া গাইঘাটায়। হাবড়া-বনগাঁ রোডে জলেশ্বর মোড় থেকে খানিকটা গেলেই নজরে এল শ্বেতশুভ্র মন্দির ঘিরে বিরাট এলাকা । বড় রাস্তার ধারে প্রকাণ্ড তোরণ, তার মাথায় লেখা- জলের নীচে মহেশ্বর/ পুণ্যতীর্থ জলেশ্বর। সিংহদ্বার পেরিয়ে এগোতেই নজর পড়ে একটি উঁচু ঢিপির ওপর সাদা মন্দির ও ডানপাশে ঘাট বাঁধানো জলাশয়। উপস্থিত ভক্তদের বেশিরভাগই স্থানীয় মহিলা। মন্দিরের পাশেই রয়েছে গাছ। সেখানে মনস্কামনা পূরণের জন্য ভক্তরা ঢিল বেঁধে যান। মূল একটি শিব মন্দির ছাড়াও এখানে রয়েছে শিবের প্রতীক্ষা মন্দির ও একটি কালী মন্দির।
কমল চৌধুরীর “উত্তর ২৪ পরগনার ইতিবৃত্ত” থেকে জানা যায় জলেশ্বরের রাজা, কাশীনাথ রায় এই শিব মন্দির নির্মাণ করেন। সেই মন্দির ভেঙে পরবর্তীকালে একটি প্রকাণ্ড স্তূপে পরিণত হয়। পাশে শিব পুষ্করণী। সেই পুকুরে শিবের প্রতীক কালো শিলাখণ্ড সারা বছর জলে ডোবানো থাকে। চৈত্র মাসের তৃতীয় সোমবার জল থেকে তোলা হয় শিবের মূর্তি। সেন বংশের রাজত্বকালে, দ্বাদশ শতকের শেষের দিকে এই এলাকার শিব পুজোর প্রচলন শুরু হয়। সেই সময় মন্দিরে ছিল টিনের ছাউনি। আর দেওয়ালে ছিল ইট এবং কাদার গাঁথনি। পরে গোবরডাঙার জমিদার রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় শিবমন্দিরের জন্য ৬০ বিঘা জমি দান করেন। ৪ একর ৪০ শতক জমির ওপর তৈরি এই পুকুর। ভক্তদের কাছে যা পরিচিত শিবপুকুর নামে। এখানকার প্রাচীন মানুষের মুখে শোনা যায় যে, এই জলেশ্বরে এক কালে চৈত্র সংক্রান্তির দিন চড়ক ভেসে উঠত। ঢাক ঢোলের বাজনা শোনা যেত, সঙ্গে শাঁখ আর কাঁসরের বাজনা। শত শত মানুষ নাকি নিজের চোখে সেই সব দেখেছে।
প্রতি বছর চৈত্র মাসের তৃতীয় সোমবার চড়কের জন্য আসা সন্ন্যাসীরা এই শিবপুকুর থেকে বিগ্রহ তুলে আনেন। পুকুরধারেই সিংহাসনে বসিয়ে টোপর মাথায় দিয়ে অভিষেক হয় জলেশ্বর শিবের। কালো শিলাখণ্ড রূপী শিবকে আনা হয় মন্দিরে। তার পরদিনই সন্ন্যাসীরা হেঁটে হালিশহরে গিয়ে বিগ্রহটি গঙ্গায় স্নান করান। তারপর স্থানীয় আটটি গ্রামের বাসিন্দাদের বাড়িতে পূজিত হয় এই শিবলিঙ্গ। মন্দিরে অধিষ্ঠিত হয়ে জলেশ্বর শিব প্রত্যক্ষ করেন গাজন উৎসব। চৈত্র সংক্রান্তির দিন বসে বিরাট চড়কের মেলা। চড়ক সন্ন্যাসীরা চড়কগাছ থেকে ঝুল ঝাঁপ, বঁটি ঝাঁপ, কাঁটা ঝাঁপ দেন।
পয়লা বৈশাখের দিন আবার এই শিবলিঙ্গ ডুবিয়ে দেওয়া হয় শিবপুকুরে। বছরের বাকি সময় অন্য একটি বিগ্রহ এই মন্দিরে পূজিত হন। সারা বছর দূর-দূরান্ত থেকে বহু ভক্ত এখানে পুজো দিতে আসেন। ভক্তদের দাবি, এখানে শিব পূরণ করেন ভক্তের মনস্কামনা।
বছরে তিনটি মেলা বসে। চড়কের সময় তো বটে, শ্রাবণ মাসে মেলার দিনেও এই মন্দিরে ব্যাপক ভক্তসমাগম হয়। শিবরাত্রিতে অসংখ্য মানুষ ভিড় জমান এই মন্দিরে। এছাড়াও বছরভর দূর-দূরান্ত থেকে মন্দির দর্শনে আসেন বহু ভক্ত।
মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে জানা যায়, মন্দির সংলগ্ন এলাকাটি পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলারও পাশাপাশি তৈরি করা হয়েছে পিকনিক স্পট। শীতের মরসুমে ভিড় জমে পিকনিক পার্টির। কমিটির পক্ষ থেকে তৈরি করা হয়েছে বিনোদন পার্ক। গাড়ি রাখার বড় জায়গা রয়েছে । গাছের ছায়ায় ঘেরা মনোরম প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানোর আদর্শস্থান জলেশ্বর শিব মন্দির।
এখন যে নতুন জলেশ্বর শিব মন্দিরটি তৈরি হয়েছে তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় সেটি একটি উঁচু মাটির ঢিপির ওপর অবস্থিত। জানা যায় যে, এখানে বহু বছর আগে এক বৌদ্ধ গ্রাম ছিল। ঢিপিগুলি তারই নিদর্শন বহন করে চলেছে। তার নিচেই হয়তো চাপা পড়ে রয়েছে বহু প্রাচীন যুগের জলেশ্বরের মূল মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। অথবা সেটি বৌদ্ধ ধর্মের কোনও মন্দির বা স্তূপেরও নিদর্শন হতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য হলে তার থেকে সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে অনুমান করা যায়।
কীভাবে যাবেন
দক্ষিণেশ্বর - বনগাঁ DN-৪৪ ধরে জলেশ্বর মোড়। বা শিয়ালদা থেকে বনগাঁ শাখার ট্রেন ধরে হাবড়া স্টেশন। সেখান থেকে অটো বা বাসে চেপে জলেশ্বর মোড়। সেখান থেকে টোটোয় আসা যাবে জলেশ্বর মন্দির। অথবা শিয়ালদহ থেকে নদীয়ার চাকদা স্টেশনে নেমে বাসস্ট্যান্ড থেকে ১৯ নম্বর বাসে সরাসরি জলেশ্বর মন্দির ৷ সরাসরি সড়ক পথে যশোর রোড ধরে হাবড়া-বনগাঁ পথে জলেশ্বর মোড় থেকে ঘুরে খানিকটা গেলেই মন্দির। পুজো বা উৎসবের দিন বাদে সকাল ৭ থেকে বেলা ২টো পর্যন্ত ও বিকেলে ৪ থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে।
লেখকের মেল আই ডি - subratatv@gmail.com
তথ্যঋণ :
১. মেলায় মেলায় আমার দেশ, ভবেশ দত্ত
২. উত্তর চব্বিশ পরগনার ইতিবৃত্ত, কমল চৌধুরী