কলকাতা: নয় নয় করে দেড় বছর পার হতে চলেছে। আর জি কর হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় বহু প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা। সেই নিয়ে এবার মুখ খুললেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু (RG Kar Case)। এবিপি আনন্দকে দেওয়া এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে অভয়াকাণ্ডের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরলেন। (Justice Biswajit Basu Exclusive)
প্রশ্ন: শুধু এ রাজ্যের নয়, দেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছিল যে ঘটনা, তা হল আর জি কর কাণ্ড। ন্যায় বিচারের দাবিতে ভারতীয় বিচারব্যবস্থার দিকে তাকিয়েছিল গোটা দেশ। কিন্তু দিনের শেষে কি ন্যায় বিচার পেলাম আমরা? হাইকোর্টের বিচার নিয়ে তো কোনও অভিযোগ ছিল না। তাও আমরা কি দেখলাম! একাট রবিবারের দুপুরে একটি স্বতঃপ্রণোদিত, দেশের সর্বোচ্চ আদালত, সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি গ্রহণ করল। কিন্তু দিনের শেষে কি ব্যবস্থাটার সংস্কার করা গেল? কতটুকু ন্যায় বিচার পাওয়া গেল? এই প্রশ্নটা তোলা কি অপরাধ?
উত্তর: দেখুন, এটা আমার নিজস্ব অ্যাসেসমেন্ট, ভারতীয় বিচারব্যবস্থার স্বাস্থ্য এই মুহূর্তে খুব ভাল যাচ্ছে না। আপনি যে নির্দিষ্ট একটি মামলার রেফারেন্স দিচ্ছেন, সেটা নিয়ে...বিচারকরাও তো নিজেদের মধ্যে অনেক রকম কথাবার্তা বলেন! সেটা নিয়ে কিন্তু...এই যে আমাদের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, তাতে হাইকোর্ট কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের ইনফিরিয়র কোর্ট নয়। এমন নয় যে, সুপ্রিম কোর্টের সুপারিন্টেন্ডেন্স পাওয়ার হাইকোর্টের উপর আছে। কী প্রেক্ষিতে একটা মামলা চলছে, কোনও পক্ষের কোনও অভিযোগ ছাড়া সেটা দিল্লিতে সুপ্রিম কোর্টে চলে গেল। এটা আমি আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারব না। কিন্তু এই ব্যবস্থা যদি চলতে যাকে, আবার বলছি, এটা কিন্তু বিচারব্যবস্থার স্বাস্থ্য়ের পক্ষে ভাল নয়।
প্রশ্ন: তাও যদি দিনের শেষে সাধারণ মানুষ দেখতেন যে ন্যায় বিচার পাওয়া গেল। আপনি ভাবুন, অভয়ার মর্মান্তিক ঘটনাটা যে রাজ্যে ঘটেছে, সেই রাজ্যের কোনও প্রতিনিধিকে না রেখে একটা দেশজোড়া কমিটি তৈরি হল হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যক্ষেত্রে মেয়েদের রাতের নিরাপত্তা নিয়ে। প্রধান বিচারপতি হিসেবে শুনানির শেষ দিন ডিওয়াই চন্দ্রচূড় নিজেই বললেন, এই কমিটির কাজ তেমন এগোয়নি। তিনি হতাশ। মানেটা কী? কারা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও সেই কাজটা করল না? তাদের কি কোনও শাস্তি হল? তার পর কী হল? একটা সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করার কাজটা কি আদৌ এগোল? না, আমরা জানতে পারলাম না। ভারতীয় বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত শ্রদ্ধাশীল আমরা। দর্শকরা জানেন। কিন্তু আর জি করের ঘটনার এত মাস পর কারও যদি মনে হয় যে, আসলে ঘটনাটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, কৌশলে শুধুমাত্র মানুষের ওই ক্রোধকে প্রশমিত করার চেষ্টা হয়েছে, তাকে কি খুব দোষ দেওয়া যাবে?
উত্তর: আপনি যেভাবে বিষয়টি দেখছেন, এই মতামত তৈরি করতে গেলে যে তথ্যগুলি থাকা দরকার, সেগুলি আমার কাছে নেই। কিন্তু আপাত ভাবে যে ব্যাখ্যাটা দিচ্ছেন, তা খুব অযৌক্তিক নয়। তাহলে দায়িত্ব এসে পড়ে কার উপরে, সেই বিচারব্যবস্থার উপরে। যে অনাস্থা বা যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে, তা ঘোচানোর দায়িত্ব কিন্তু এসে পড়ে বিচারব্যবস্থার উপর। আরজি করের মামলার টিটবিটস আমি জানি না। কারণ একজন বিচারপতি, অন্যের কোর্টে কী মামলা উঠছে, তা নিয়ে মাথা গলানোর সময় থাকে না। সম্ভব নয় সেটা। কিন্তু যেটা আমার কাছে হয়েছিল, সেটাতে আমার অবস্থান খুব পরিষ্কার। জানেন আমি একটার পর একটা রায় দিয়েছি। তাতে আমার মনে হয়েছিল, অথরিটিরা যেটা করেছে, তা ঠিক না। বেআইনি। সেই অনুযায়ী রায় দিয়েছি।
প্রশ্ন: এর কারণ বোধহয় একটা যে বিচারব্যবস্থা থেকে মানুষের প্রত্যাশা বিপুল। মানুষ যখন দেখে, সবাই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, একমাত্র তার ভরসার জায়গা হচ্ছে ভারতীয় বিচারব্যবস্থা। ফলে হয়ত প্রত্যাশাও বাড়ছে, এটাও ঠিক।
উত্তর: রিট পিটিশন তো আপনি অজস্র দেখেছেন! তার প্রথম লাইন থাকে, পিটিশনার ইজ আ ল অ্যাবাইডিং সিটিজেন। আমি বলছি আপনাকে, আমার সব বিশ্বাস নিয়ে বলছি, বারতবাসী সাধারণ আইনের অনুগত নাগরিক। আমি অফ দ্য ট্র্যাক উদাহরণ দিয়ে বলছি, আসামিকে জেলা আদালতে তোলা হচ্ছে। আসামির যা চেহারা, তার সঙ্গে পুলিশ যিনি, ফুঁ দিলে পুলিশ উড়ে যাবে। কিন্তু আমি দেখেছি, আসামি বলছে, 'এই হাতটা ঠিক করে ধরো।' প্রোডাকশন করার মতো পুলিশ ফোর্স নেই। তার মানে যত বড় অপরাধী হোক, কোর্ট সম্পর্কে যে সমীহ, জনগণের যে সমীহ, বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব সেটা যাতে বজায় থাকে, সেটা দেখার দায়িত্ব বিচারবিভাগের। কিন্তু সবচেয়ে মুশকিল হচ্ছে যেটা, বিচারব্যবস্থাকে যদি আইনব্যবস্থা গুরুত্ব না দেয়...বিচারব্যবস্থা চালাতে গেলে প্রায়োরিটির প্রশ্ন। মানে টাকাপয়সার ব্যাপার আছে, বাজেট আছে, সদিচ্ছার প্রয়োজন আছে। আপনি যদি অ্যানালিসিস করেন, কত শতাংশ? বিচারব্যবস্থায় প্রতি বাজেটে কত শতাংশ? সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতির কাছ থেকে হিসেব পাচ্ছিলাম, বোধ হয় ৩৫ পয়সা। এমন কিছু একটা। উনি বলছিলেন, ওটাকে যদি ১০ টাকা, কী ১০০ টাকা করা যায়, তাহলে ভেসে যাবে। এটা ঘটনা। বড় বড় বিল্ডিং হয়েছে, জেলা আদালত হয়েছে, জেলা বাইফারকেশন হয়েছে। কিন্তু ইমপ্লিমেন্টেশনের ক্ষেত্রে আমি অর্ডার মান্য করব। অর্ডার পছন্দ না হলেও কার্যকর কর, এই সদিচ্ছা থাকা দরকার। অপ্রয়োজনে সেগুলিকে এড়িয়ে চলা...আমি নাম বলছি না। এমন এক অ্যাডভোকেট জেনারেলকে জানি, তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই। তাঁকে বলতে শুনেছি, 'না, এই আইন এমন ভাবে হতে পারে না। আমাকে সময় দাও। আইন সংশোধন করে নিয়ে আসব'। সেরকম সাম্প্রতিক অতীতে দেখিনি আমি।