কলকাতা :  খুব অন্ধকার সময়ের ভরসা তাঁরা। মানুষের কাছে তাঁরা ভগবান। তাঁরা ব্যর্থ হতেই পারেন না, এতটাই আস্থা নিয়ে তাঁদের কাছে আসেন মানুষ। তাঁদের লড়াই রোগ বালাইয়ের সঙ্গে, আবার সামাজিক কুসংস্কারের সঙ্গেও।  চিকিৎসা ক্ষেত্রে নানারকম প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে মানুষকে আলোর পথ দেখানো তাঁদের প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জ। তাঁরা ডাক্তার। ডাক্তারের কোনও নারী পুরুষ ভেদ হয় না। তাঁদের একটাই কাজ মানুষকে ভাল রাখা। ৮ মার্চ, নারী দিবসটা তাঁদের কাছে কেমন? এবিপি লাইভ কথা বলল, এই বাংলার দুই চিকিৎসকের সঙ্গে।  চিকিৎসক অনিন্দিতা ঝা। পূর্ব মেদিনীপুরের কসবাগোলা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক। কর্মসূত্রে ১৭ বছর আগে চলে এসেছিলেন বাংলা-ওড়িশার সীমান্তে এই প্রত্য়ন্ত গ্রামে। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলোর কারও কাছে তিনি দিদিমণি, তো কেউ ডাকেন মা-বুড়ি।  তিনি মনে করেন, প্রতিটি দিনই নারীদের। আলাদা করে নারীদিবস পালনের গুরুত্ব নেই তাঁর কাছে। বরং মনে করেন, দিবস পালনের আগে একটা ধারণা স্পষ্ট হওয়া দরকার, নারীর স্বাধীনতা একান্ত নারীর নিজস্ব, সেটা দেওয়ার মালিক অন্য কেউ নন।  'অনেক পুরুষ বলেন আমি আমার স্ত্রীকে চাকরি করার অনুমতি দিয়েছি। শাশুড়ি বলেন, আমার বউমা স্লিভলেস পরলে, আমার আপত্তি নেই। আবার কোনও শাশুড়ি বলছেন, আগে তো নাতির মুখ দেখে নিই। তারপর যা খুশি হোক...সেখানে একজন মহিলা হয়ে আরেকজন মেয়ের এরপর পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন তিনি। এখানেই নারী স্বাধীনতা, প্রগতিশীল ভাবনাগুলো থমকে যায়। আসলে নারীকে কেউ স্বাধীনতা দেবে কেন, তিনি তো স্বাধীনই'। চিকিৎসক অনিন্দিতার কথায়, 'আমার কাছে রোজই ৮ মার্চ । কারণ, আমি স্বাধীন আমার জন্য। আমি যা পারি না, তা স্পষ্ট বলে দিতে পারি লজ্জা পাই না। আলাদা করে দিনটা পালন করি না ' অনিন্দিতার কথায়, নারী দিবস তখনই সার্থক, যখন জাগ্রত হবে চেতনা। যখন মেয়েকে মা বোাঝাতে পারেন, স্কুল ইউনিফর্মে মেনস্ট্রুয়েশনের রক্ত লেগে যাওয়া লজ্জার কিছু নয়। যেন একজন মেয়েকে খারাপ ভাবে কেউ ছুঁলে, সে মাকে এসে বলতে পারে। আমি এগুলো আমি আমার মেয়েকে বোঝাতে পেরেছি। এগুলোই আমার কাছে নারীদিবসের সেলিব্রেশন।  আমার পায়ে যে কাঁটা ফুটেছিল, সেই কাঁটায় আমার পরবর্তী প্রজন্ম যেন রক্তাক্ত না হয়'  

চিকিৎসক অনন্দিতা ঝা

অনেক মা, অনেক লড়াকু নারীকে তিনি দেখছেন প্রতিটা দিন। যাঁরা হয়ত জানেনই নারী দিবসের মানে। তথাকথিত শিক্ষিত না হয়েও লড়াকু ও প্রগতিশীল মানসিকতায় তৈরি করছেন উদাহরণ। তেমন মানুষরাই চিকিৎসক অনিন্দিতা ঝার চোখে আইকন।   চিকিৎসক বাবার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন জনসেবার মন্ত্র আর, মেরুদণ্ড সোজা রাখার শিক্ষা, সেই শিক্ষায় পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চার করা তাঁর কাছে নারী দিবসের সেলিব্রেশন। 

চিকিৎসক অগ্নিমিতা গিরি সরকার। পেশায় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ তিনি। সেই সঙ্গে তাঁর দিন কাটে কর্কটরোগ যোদ্ধাদের সঙ্গে। ক্যান্সারের কামড়কে জয় করে বহু নারীকে জীবনের স্রোতে ফেরানোর জন্য তাঁর নিরন্তর প্রচেষ্টা। তাঁর কাছে  প্রতিদিনই নারী দিবস। ডা. অগ্নিমিতা গিরির কথায়,  মেয়েরা কর্মরতা হোন বা হোম-মেকার, দিনভর কাজ করে যেতে হয় তাঁদের। ঘরে - বাইরে বিরাট দায়িত্বভার তাঁরা পালন করে চলেন। তাই তাঁরা সবসময়ই মেহনতি মানুষ।  তাই চিকিৎসকের কাছে প্রতিদিনই নারী দিবস। 

কর্মসূত্রে দেখেছেন, অনেকের  বাড়িতে পুত্রসন্তানরা বেশি সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন। অভিভাবকরা হয়ত বেশি ভাবিত হচ্ছেন ছেলে সন্তানটিকে নিয়ে। অনেক রোগীকে বলতে শুনেছেন, ছেলে রোজগার করে খাওয়াবে, মেয়ে তো অন্য বাড়িতে চলে যাবে। এই ভাবনা বৈষম্যটা দূর করা দরকার। মেয়েকেও বোঝাতে হবে, ভাই বা দাদার মতো, মা-বাবার দায়িত্ব তাঁরও।  চিকিৎসক হিসেবে তিনি মনে করেন, ভাল থাকা বা সুস্থ থাকা মানে শুধু শারীরিক সুস্থতা নয়, মানসিক ভাবে ভাল থাকাও। মেয়েদের মানসিক ভাবে ভাল থাকার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কাজের ক্ষেত্রে হোক বা পরিবারে, অধিকারের প্রশ্নে যেন ছেলে , মেয়ের  তফাৎ না থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় , পরিবারে মহিলাদের স্বাস্থ্য সমস্যাগুলি অবহেলিতই থেকে যায়। সেগুলোর দিকে নজর দেওয়া, মেয়েদের মেনস্ট্রুয়াল হেলথের দিকে নজর দিতে হবে। সচেতন হতে হবে ব্রেস্ট ক্যান্সার বা সারভাইকাল ক্যানসার নিয়ে। একজন মেয়ের জন্য আরেকজন মেয়েকেই পাশে দাঁড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, বাড়ির পুরুষমানুষটি যদি মাথার ওপর ছাদ হন, তাহলে সংসারকে স্তম্ভ হিসেবে ধরে রাখেন নারীরাই। তাই তাঁদের ভাল থাকা, একদিন নয়, প্রতিদিন ভাল থাকাই নারীদিবসের সার্থকতা। সমাজের মননকে কলুষমুক্ত করাতেই নারীদিবসের সার্থকতা। 

 

ডা. অগ্নিমিতা গিরি সরকার