এই বছর বাংলা থেকে  পদ্মসম্মান পেয়েছেন ৯ জন। তাঁর মধ্যেই অন্যতম মছলন্দপুরের ঢাক বাদক গোকুল চন্দ্র দাস। ১৩৯ জন পদ্মপ্রাপকের মধ্যে তিনিও একজন। ঢাক তাঁকে অন্ন দিয়েছে, দিয়েছে সম্মান, চিনিয়েছে কঠিন পথ। কিন্তু এত বড় সম্মান যে তাঁর হাতে উঠবে , তা কল্পনা করতে পারেনি, গ্রামে ফিরে আবেগপ্রবণ গোকুল।

অনুষ্ঠানের জন্য কয়েকদিন দিল্লিতেই ছিলেন গোকুল বাবু। মঙ্গলবার বেলা একটা নাগাদ বনগাঁ লোকালে শিয়ালদহ থেকে মসলন্দপুরে নামেন গোকুল বাবু। স্থানীয় বলাকা ক্লাবের মাঠে তখন অধীর অপেক্ষায় তাঁরই হাতে তৈরি মহিলা ঢাকির দল। অভ্যর্থনা জানাতে হাজির ছিলেন বহু মানুষ।  ঢাকি গোকুল দাসের পদ্মশ্রী পাওয়া যান গ্রামেরই বিরাট প্রাপ্ত। বাড়িতে ফিরতেই তাঁকে নিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন সকলে।  মসলন্দপুর তাঁকে বরণ করে নিল ঢাকের বাদ্যিতেই।  একেবারে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল বাড়ি ।  তারপর পাড়ার ক্লাবে দেওয়া হল সংবর্ধনা। পদ্মশ্রী পেয়ে গোকুল আবেগ ধরে রাখতে পারছিলেনই না। তাঁর ঢাকের বাদ্যি যে এই সম্মান এনে দেবে ভাবেননি কখনও। ঢাক তাঁর প্রাণ। এই ঢাকই তাঁর পরিচয়, রুজি-রুটি, মা লক্ষ্মী। দু-বেলা দু-মুঠোর জোগান দিয়েছে এই বাদ্যযন্ত্র, দিয়েছে সম্মানও। অনুষ্ঠান করেছেন উস্তাদ জাকির হোসেনের সঙ্গে।

গোকুলের বাবা মোতিলাল দাসও ছিলেন বিখ্যাত ঢাকি। ৪-৫ বছর বয়স থেকেই হাতে-কাঠি তাঁর।বাবার সঙ্গে ঢাক বাজাতে বাজাতে তালের সঙ্গে সংসার শুরু। তারপর কত চড়াই - উৎরাই। বাংলার ঢাক তাঁর হাত ধরে পৌঁছেছে বিদেশেও । বাজিয়েছেন উস্তাদ জাকির হুসেনের সঙ্গেও । এখন শিল্পী তন্ময় বসুর 'তালতন্ত্রের' সঙ্গে যুক্ত গোকুলচন্দ্র দাস। 

সাফল্যের দিনে তিনি ভোলেননি সেইসব স্ট্রাগল।  বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঢাক বাজাতে গিয়ে অনেকবারই অবহেলার শিকার হয়েছেন, মনে পড়ে এখন বেশি করে। কিন্তু সে-সব মাথায় না রেখে, ঢাক আঁকড়ে থাকার ফলই পেয়েছেন আজ গোকুল। আজ সুসময়ে, তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের কাছে তাঁর আবেদন, ঢাক বাজানোর প্রশিক্ষণ দেওয়ার কোনও প্রতিষ্ঠান নেই, নেই কোনও বইও। সরকার যদি এমন উদ্যোগ নেয়, তিনি শেখাবেন বিনা পারিশ্রমিকে। বাংলায় মহিলা ঢাকিদের দল তিনিই প্রথম তৈরি করেন। মাত্র ৫-৬ জন মেয়েকে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন প্রথমে। আর এখন, তাঁর দেড়শোর বেশি ছাত্রী। বহু মহিলা স্বনির্ভর হয়েছেন  ঢাক বাজানো শিখে। সেই মহিলা ঢাকিরাই এদিন ঢাক বাজাতে বাজাতে তাঁদের গুরুদেবকে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যান।