দীপক ঘোষ ও রাজীব চৌধুরী, কলকাতা : দলের অন্দরে তৈরি হওয়া ক্ষোভের আগুনে ছারখার হয়ে গেল তৃণমূল। বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে যা হল, তার সঙ্গে মহারাষ্ট্রের শিন্ডে-মডেলেরও তুলনা চলে না। কারণ, সেখানে শিবসেনায় যখন বিদ্রোহ হয়েছিল, তখন তারা ক্ষমতায়। শিন্ডে-শিবিরের হাত ধরেই বিরোধী বিজেপি শাসকের আসনে বসেছিল। কিন্তু, এরাজ্য়ে বিজেপি একা ২০৮টি আসন পেয়েছে। ফলে তৃণমূলে কী হচ্ছে, তাতে তাদের কিছুই যায় আসে না।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'সবেধন নীলমণি' দল এখন ভেঙে টুকরো টুকরো। ভোটে হারার এক মাসের মধ্য়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল শেষ। দলেরই অন্দরে তৈরি হওয়া ক্ষোভের আগুনেই ছারখার হয়ে গেল তৃণমূল। অন্য কোনও দলকে কিছু করতে হল না। বছরের পর বছর তৃণমূলের অন্দরে যে অসন্তোষের বারুদ জমছিল, তার বিস্ফোরণেই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল দল। দলত্যাগী তৃণমূল নেতা বিশ্বজিৎ দেব বলছেন, "অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমি দায়ী করব। তার সঙ্গে আমি মমতা দি-কেও দায়ী করব।"
তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচিত বিধায়কদের বড় অংশের বিদ্রোহ ঘোষণাকে অনেকে অতি উৎসাহী হয়ে, মহারাষ্ট্রের শিন্ডে-মডেলের সঙ্গে তুলনা করছিলেন। কিন্তু, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এরাজ্যে তৃণমূলের মধ্যে যা ঘটেছে, তার সঙ্গে মহারাষ্ট্রের শিন্ডে মডেলের কোনও মিলই নেই। কারণ শিবসেনায় যখন বিদ্রোহ হয়, তখন তারা মহারাষ্ট্রে ক্ষমতায়। শিবসেনায় ভাঙনের ফলে সে রাজ্য়ে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছিল। একনাথ শিন্ডের বিদ্রোহে মহারাষ্ট্রে বিজেপির লাভ হয়েছিল। তাদের সমর্থন ছাড়া বিজেপি মহারাষ্ট্রে সরকারই গড়তে পারত না। কিন্তু এই রাজ্য়ে বিজেপি একাই ২০৮টি আসন পেয়েছে। তার ফলে তৃণমূলে কী হচ্ছে, তৃণমূল ভাঙছে না গড়ছে, তাদের তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। তাদের সরকার এমনিতেই নিরাপদ। তাই মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরের হাত থেকে শিবসেনার নেতৃত্ব একনাথ শিন্ডের হাতে চলে যাওয়ার সঙ্গে এ রাজ্যে তৃণমূলের রাশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে চলে যাওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই।
অধ্য়াপক রাজাগোপাল ধর চক্রবর্তী বলেন, "শিন্ডে মডেলের সঙ্গে আমি তো কোনও মিল দেখতে পাচ্ছি না। এরা দলের মধ্যেই শাসনটা ধরতে চাইছে। বোধহয় তাঁরা অভিষেককে সরাতে চেয়েছেন বলেই এই ব্যাপারটা রয়েছে। কিন্তু, একনাথ শিন্ডে কিন্তু বলেননি যে উদ্ধব ঠাকরে, তাঁর ছেলেকে সরাতে হবে। সে ধরনের ছিল না। এখানে আমরা দেখলাম, লক্ষ্যটা অভিষেককেই সরানো।"
২০২২ সালে একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে উদ্ধব ঠাকরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন শিবসেনার ২৯ জন বিধায়ক। সংখ্য়া হারিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয় উদ্ধব ঠাকরের সরকার। আর শিবসেনার বিদ্রোহীদের হাত ধরে বিজেপি। জোট বেঁধে মহারাষ্ট্রে সরকার গঠন করে তারা। পরবর্তীকালে আসল শিবসেনা হয় একনাথ শিন্ডেরাই।
অধ্যাপক প্রতীপ চট্টোপাধ্যায় বলছেন, "শিবসেনা ভেঙে গিয়েছিল তার কারণ উদ্ধব ঠাকরে কিন্তু শিবসেনা-বিজেপি বা কট্টর হিন্দুত্ববাদী যে জোট তার থেকে সরে গিয়ে কোথাও তারা কংগ্রেসের সঙ্গে যাচ্ছিল। এই যে আদর্শগত বিচ্যুতি সেই প্রশ্নটা শিন্ডে তুলেছিলেন এবং ভেঙে গিয়েছিল শিবসেনা । পশ্চিমবঙ্গে আমরা দেখলাম, খুব সহজভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে প্রত্যেকের মনে নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ছিল। যাদের মনে এই প্রশ্ন ছিল তাঁরা সেটা আজ সবার সামনে ব্যক্ত করেছেন। ফলে, এটা ক্ষমতার প্রশ্ন, নেতৃত্বের প্রশ্ন। কার হাতে তৃণমূল কংগ্রেসের রাশ থাকবে সেই প্রশ্ন।"
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল এখন নিশ্চিহ্ন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অস্তিত্বই এখন বিপন্ন। আর উল্টোদিকে গোটা বিষয়টি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে বিজেপি।
