কলকাতা: ঠাকুরের পায়ের কাছে অঙ্ক বই দিতেন না কোনোদিন। মনে হত, ঠাকুরের পিছন দিকটা গেলেই তো দেখা যায়, মূর্তিটা কী দিয়ে তৈরি। আছে তো শুধু কাঠামো, খড় আর মাটি। সেই দিয়ে তৈরি মূর্তির পায়ের সামনে বই দিলেও যা হবে, না দিলেও তাই। পড়াশোনায় ভাল ছিলেন না কখনও, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে সাহিত্যপ্রেম। বর্তমানে তাঁর পেশাও সেই সরস্বতী আরাধনাই। সরস্বতী দেবী প্রতিমার উপর বিশ্বাস না থাকলেও, উৎসবে সামিল হতে কখনও পিছপা হননি তিনি। শাড়ি পাঞ্জাবির সমীকরণ তাঁর লাগত বেশ। সরস্বতী পুজো মানেই ছোটবেলার উৎসাহ, আয়োজন আর প্রেমিকার পাড়ার পুজো। ফেলে আসা সরস্বতী পুজোর গল্প শোনালেন অভিনেতা পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
ছোটবেলায় কখনও ভাল ছাত্র ছিলেন না তিনি, তবে তাঁকে খুব টানত সরস্বতী প্রতিমা। পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, 'সরস্বতীর সঙ্গে যে শিল্প জড়িয়ে রয়েছে, তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি। যে সমস্ত মানুষেরা প্রতিমা তৈরি করেন, তাঁর চোখটা আঁকেন, সেই শিল্পীদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা। তবে কখনও দেবীমূর্তি দেখে মনে ভক্তিভাব জাগেনি। মনে হয়নি এই দেবীর সামনে বই দেব। অনেকেই দেখতাম, দেবীর পায়ের কাছে যে বিষয়ে সবচেয়ে ভয়, সেই বইটা রাখত। আমি জানতাম, বই রাখলেও যা হবে, না রাখলেও তাই। পড়াশোনায় কখনও ভাল ছিলাম না। কিন্তু এখন তো আমার কাজ সরস্বতীকে নিয়েই। চিত্রনাট্য শুনি, পছন্দ হলে তবেই কাজ করি। অর্থহীন চিত্রনাট্য বাতিল করে দিই। সরস্বতীর আরাধনা করি বলেই আমার সংসারে লক্ষ্মী আসে। সরস্বতী আর লক্ষ্মী তো দুই বোন, এক বোনকে ভালবাসি বলেই আরেক বোন আমার সংসারে আসেন।'
ছোটবেলার সরস্বতী পুজো মানেই তো পাড়ায় বা স্কুলের পুজো। তেমন পুজোর সঙ্গে যুক্ত থাকতেন পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও। বলছেন, 'আমাদের পাড়ায় একজন বড় দাদা ছিলেন। তিনি পাড়ার সব কচিকাঁচাদের নিয়ে বছরে কয়েকটা নাটক করতেন। তাঁর উদ্যোগেই হত পাড়ায় সরস্বতী পুজো। চাঁদা উঠত ১০-২০ পয়সা.. গোটা পুজো সামাল দেওয়ার পয়সা কোথায় তখন? কাজেই চুরি? পাশের বাড়ির ক্ষেতের কপি, বাঁশ চুরি করে আনতাম। সেগুলোই লাগত পুজোর কাছে। তা নিয়ে অভিযোগ অনুযোগ কিছু কম আসত না। কিন্তু সেই দাদা সবটা মিটিয়ে দিতেন।'
আর সরস্বতী পুজোয় প্রেম? একটু হেসে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, 'তখনও আই লাভ ইউ বলার চল হয়নি। যাঁকে ভাল লাগত, সে শাড়ি পরবে, তাঁর সঙ্গে পুজোর দিনটা দেখা হবে, একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া হবে, এটাই ছিল প্রধান আকর্ষণ। ওর যেখানে বাড়ি ছিল, তার কয়েকটা বাড়ি পরেই আমরা পুজোর আয়োজন করতাম। ও আসত। আমার সেই প্রেমিকাই আমার স্ত্রী হয়েছিলেন পরবর্তীকালে। তাঁর সঙ্গেই তো জীবনটা কাটালাম।'