কলকাতা: 'পঞ্চায়েত' তাঁকে দিয়েছে খ্যাতি, পরিচিতি। যদিও তাঁর নিজের নামের চেয়ে তিনি এখন বেশি পরিচিত 'বিনোদ' বলেই। 'পঞ্চায়েত'-এর প্রতিটা সিজনেই এই বিনোদের উপস্থিতি যেন আলাদা মাত্রা যোগ করে। তাঁর অভিনয়ে যেমন রয়েছে অদ্ভুত এক সারল্য, তেমনই অনাবিল হাস্যরস। তাঁর কথা বলার ধাঁচ থেকে শুরু করে সংলাপের মধ্যে মিশিয়ে দেওয়া সারল্য, সবকিছুই দাগ কেটে যায় দর্শকদের মনে। পর্দায় যাঁকে 'বিনোদ' বলেই চেনেন দর্শক, সেই অভিনেতার আসল নাম অশোক পাঠক। তবে তাঁর কীর্তি কিন্তু শুধুমাত্র 'পঞ্চায়েত' -এর ফুলেরাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এই অভিনেতা পা রেখেছেন কান চলচ্চিত্র উৎসবের লাল গালিচায়। তাঁর চলচ্চিত্র 'সিস্টার মিডনাইট'-তাঁকে কান চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়ার টিকিট এনে দিয়েছে। কিন্তু অশোকের এই আলো ঝলমলে সফরের পিছনে রয়েছে অনেক অজানা গল্প।

জন্ম বিহারে, সঙ্গী দারিদ্র

অশোক পাঠকের জন্ম হয়েছিল বিহারের একটি গ্রামে। পরিবার সচ্ছল নয়, ছোটবেলা থেকেই অশোকের সঙ্গী হয়েছিল দারিদ্র। একটু বড় হতে, সংসারের জন্য রোজগারের চেষ্টা করতে থাকে অশোক। সেই সময়ে তাঁর কাকার সঙ্গে তুলো বিক্রি করতেন তিনি। দিনে আয় হত মাত্র ১০০ টাকা। অশোক জানিয়েছেন, তিনি অভাবকে এতটা কাছ থেকে দেখেছেন যে পরবর্তীকালে সেই অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয় জীবনে কাজে লেগেছে। স্কুল জীবন শেষ করার পরে অশোক হরিয়ানায় চলে আসেন ও কলেজে ভর্তি হন।

কলেজে পড়াকালীনই অশোকের পরিচিতি থিয়েটারের সঙ্গে। কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েই অশোক প্রথম বুঝতে পারেন, তাঁর থিয়েটারের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। সেই থেকেই নিয়মিত থিয়েটারে অভিনয় করতে শুরু করেন তিনি। একবার একটি অভিনয় করে, ৪০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পান অশোক। ঠিক করে ফেলেন, সেই টাকা নিয়েই ভাগ্য পরীক্ষা করতে পাড়ি দেবেন মুম্বই। একটি সাক্ষাৎকারে অশোক বলেছিলেন. 'আমার বাবা (রাম নরেশ পাঠক) একজন দিন মজুর ছিলেন, গ্রামে থাকতেন। আমি পড়াশোনায় ভাল ছিলাম না। সুপারিশের ভিত্তিতে, আমি স্নাতক হওয়ার জন্য সিআরএম জাট কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম, তবে সেটাই আমার জীবন পরিবর্তন করে দেয়। যুব উৎসবে, আমি সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতেছিলাম এবং আমরা জাতীয় পর্যায়েও জিতেছিলাম। আমি (অভিনেতা) আশুতোষ রানা স্যারের কাছ থেকে পুরস্কৃত হয়েছিলাম। আমার ছবি সর্বত্র ছিল (সংবাদপত্রে), এটা একটি ছিল বিশাল ব্যাপার ছিল আমাদের সবার কাছে। তারপর পরিবার আমায় বলল. ‘যেটা ভাল লাগে, সেটাই কর’

মায়ানগরীর স্বপ্নসফর

মুম্বই আসার পর, অশোক ধীরে ধীরে বিভিন্ন জায়গায় অডিশন দিতে শুরু করেন, এখানে সেখানে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করতে থাকেন। খুব ধীরে ধীরেই কাজ পাচ্ছিলেন তিনি, তবে প্রতিটি চরিত্র তাঁর দক্ষতা বাড়িয়ে তুলছিল আর তাঁকে যেন সাফল্যের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসছিল। অবশেষে তাঁকে খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দিল 'পঞ্চায়েত'। দুর্গেশ কুমার অর্থার পর্দার ভূষণের সঙ্গে অশোকের জুটিতে মানুষ ভালবাসলেন। একটি সাক্ষাৎকারে অশোক বলেন, 'আমি ২০১১ সাল থেকে এই ইন্ডাস্ট্রিতে আছি এবং বিট্টু বস (২০১২), ১০২ নট আউট (২০১৮) এবং সেক্রেড গেমসের মতো বেশ কয়েকটি ভালো কাজের অংশ হয়েছি, তবে বিনোদের চরিত্র আমার জীবন বদলে দিয়েছে... সবাই চিনতে শুরু করেছে। অনেক ভালোবাসা পাচ্ছি এবং এটাই সবচেয়ে বড় সম্পদ'

ফুলেরা থেকে ফ্রান্স

অশোকের ছবি ‘সিস্টার মিডনাইট’ কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে প্রদর্শিত হয়েছিল। ছবিতে রাধিকা আপ্টেও ছিলেন এবং ছবিটি ১০ মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওভেশন পেয়েছিল। গ্রামের রাস্তায় তুলো বিক্রি করা থেকে কান-এর লাল গালিচায় হাঁটা, অশোকের সফর শোনায় স্বপ্নের মতোই।