ব্রেন টিউমার মানেই আতঙ্ক, ভয়াবহতা। বোধ হয় জীবনের সময়টা মাপা হয়ে গেল। সত্যিই কি তাই ? ব্রেন টিউমার মানেই কি  মৃত্যুর পরোয়ানা ? ওয়ার্ল্ড ব্রেন টিউমার ডে-তে এবিপি লাইভ বাংলা কথা বলল, রুবি জেনারেল হাসপাতালের নিউরোসার্জেন ডা. বিশ্বজিৎ সেনগুপ্ত ও পিয়ারলেস হাসপাতালের চিকিৎসক নিউরোসার্জেন প্রসাদ কৃষ্ণন  । সব ব্রেন টিউমারই ক্যান্সারের দিকে এগোয় ? কোন লক্ষণে বুঝবেন ? সাধারণ মাথা ব্যথার সঙ্গে ব্রেন টিউমারের যন্ত্রণার ফারাক কোথায় ? সব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলেন বিশিষ্ট চিকিৎসকরা।

ব্রেন টিউমার মানেই মৃত্যু এই ধারণাকে প্রথমেই খণ্ডন করলেন তিনি। তিনি জানালেন, বেশিরভাগ ব্রেন টিউমারই সেরে যায়, যদি তা ক্যান্সারাস না হয়। আর যদি তাতে ম্যালিগন্যান্সি থাকে তাহলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে এখন অনেকটাই বেড়েছে সাফল্যের হার। তবে সবটাই নির্ভর করছে রোগী কী অবস্থায় এলেন, ব্রেন টিউমারের অবস্থানটা কোথায়। প্রথমেই যে জিনিসটায় জোর দিলেন চিকিৎসক, তা হল ব্রেন টিউমার যত তাড়াতাড়ি ধরা পড়বে ততটাই ভাল। ধরা পড়তে গেলে, রোগীকে চিনে নিতে হবে উপসর্গগুলি। তবে তা সত্ত্বেও বেশ কিছু ধোঁয়াশা থেকে যায়। ঠিক কোন ধরনের মাথার যন্ত্রণা ব্রেন টিউমারের লক্ষণ, মাথা যন্ত্রণা ছাড়া কি আর কোনও লক্ষণ নেই ? 

রুবি জেনারেল হাসপাতালের নিউরোসার্জেন ডা. বিশ্বজিৎ সেনগুপ্ত জানালেন, ব্রেন টিউমার এমন একটা অসুখ, যা হতে পারে ছোট শিশু থেকে বৃদ্ধেরও। হয়ত অনেকেই উপসর্গ বোঝেন না, অন্য কোনও সমস্যা নিয়ে আসেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় হয়ত একটা টিউমার ধরা পড়ে যায় মস্তিষ্কে। তবে কয়েকটি প্রাথমিক উপসর্গের দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। 

  • প্রথমেই মাথা ব্যথার কথা বললেন চিকিৎসক। সব মাথা ব্যথা আবার ব্রেন টিউমারের লক্ষণ নয়। এই ধরনের মাথা ব্য়থা সাধারণত বাড়ে সকালের দিকে। হয়ত সকাল সকাল মাথার যন্ত্রণায় ঘুমটাই ভেঙে গেল। তারপর প্রচণ্ড বমি পেল। বমি হতে শরীরটা স্বস্তি পেল। এরকম যদি দিনের পর দিন চলতে থাকে , তাহলে অবশ্যই নিউরোসার্জেনের পরামর্শ নেওয়া দরকার। 
  • এই মাথা ব্যথা সাধারণত সারা মাথা জুড়ে হয়। সঙ্গে বমি হয়। সাধারণত মাথা ব্যথার ওষুধেও বিশেষ কাজ হয় না। 
  • তবে এটাও মনে রাখা আবশ্যক যে, এই ধরনের মাথা ব্যথা কিন্তু অন্য অসুখেরও ইঙ্গিত হতে পারে। তাই নিশ্চিত হতে করাতেই হবে পরীক্ষা। নিদেন পক্ষে একটি সিটি স্ক্যান।  
  • এছাড়া হতে পারে, চোখে কম বা ঝাপসা দেখার সমস্যা। কিংবা ডাবল ভিসনের সমস্যাও আসতে পারে, যা হয়ত বারবার পাওয়ার বদলেও শুধরোয় না। 
  • রোগী ভুলে যেতে পারেন। ঘনঘন মেজাজ পরিবর্তন হতে পারে।
  • কথা বলতে গিয়ে দিশা হারাতে পারেন। 
  • হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ধাক্কা খেতে পারেন, দিক ভ্রষ্ট হয়ে।
  • এছাড়াও হাত থেকে জিনিস পড়ে যাওয়া, শরীরের কোনও দিক দুর্বল হয়ে পড়া, কথা বার্তা জড়িয়ে যাওয়াও এর লক্ষণ। অনেকটা স্ট্রোকের মতো লক্ষণ আসতে পারে। হয়ত সিটিস্ক্যান করে ধরা পড়ল একটি বড় টিউমার। 
  • এছাড়াও, হয়ত কারো ছোটবেলায় খিঁচুনি হয়নি কখনও , অথচ মধ্যবয়সে হঠাৎ খিঁচুনির সমস্যা শুরু হল, এটা কিন্তু ব্রেন টিউমারের প্রকট লক্ষণ।  
    ডা. বিশ্বজিৎ সেনগুপ্ত

পিয়ারলেস হাসপাতালের চিকিৎসক নিউরোসার্জেন প্রসাদ কৃষ্ণন এই বিষয়ে জানালেন, টিউমারের লক্ষণ নির্ভর করে তার অবস্থানের উপর। কোথাও টিউমার হলে , প্রথম দিকেই তা নানারকম অসুবিধের সৃষ্টি করে জানান দেয়। মাথার বাঁদিকে ব্রেন টিউমার হলে নানা উপসর্গ সামনে আসে তাড়াতাড়ি। আবার মস্তিষ্কের কম সক্রিয় জায়গাগুলিতে টিউমার থাকলে, তা উপসর্গ সৃষ্টি করে কম। ফলে রোগী সতর্ক হতে পারেন না। যেমন, মস্তিষ্কের যে অংশ কথা বলার জন্য ব্যবহৃত হয়, সেখানে টিউমার হলে প্রথমে কথা বলার সমস্যা আসে। যে অংশ হাঁটা চলার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে টিউমার হলে হাঁটাচলায় সমস্যা তৈরি হয়। আবার ব্রেনের যে কোষগুলি দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে, সেখানে টিউমার হলে চোখে ঝাপসা দেখা বা অন্ধত্বের সমস্যা আসে। আবার মস্তিষ্কের ডানদিকে মাথার সামনের দিকে যদি টিউমার তৈরি হয়, তবে তা জানান দেয় দেরিতে। খুব বুদ্ধি-নির্ভর কাজ না করলে, তা বিশেষ কাজে আসে না। তাই উপসর্গ বোঝা যায় না। এগুলি সবই ম্যালিগন‍্যান্ট টিউমারের কথা। ক্যান্সারাস টিউমার সাধারণত ব্রেনের ভিতরের দিকে হয়। 

অনেক নন-ম্যালিগন‍্যান্ট অর্থাৎ নন-ক্যান্সারাস টিউমার হয়, যা মস্তিষ্কের বিভিন্ন জায়গায় অনেক দিন ধরে তৈরি হয়। খুব ধীরে ধীরে বাড়ে। এগুলো সাধারণত ব্রেনের বাইরের দিকে হয়। যখন সেগুলো বড় হয়ে যায়, তখন তা ব্রেনের উপর চাপ ফেলে। হয়ত শরীরের একদিক দুর্বল হয়ে পড়ে। হাত থেকে জিনিসপত্র পড়ে যায়, লিখতে অসুবিধা হয়। তারপর হয়ত একদিন প্রচণ্ড খিঁচুনি হয়। তখন পরীক্ষা করে বিষয়টা ধরা পড়ে।

চিকিৎসক দের মতে, এই লক্ষণগুলো অবশ্যই জেনে রাখা দরকার। এরকম কিছু হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। মনে রাখতে হবে, এই লক্ষণ দেখা যাওয়া মানেই কিন্তু ব্রেন টিউমারই হয়েছে এমনটা নয় । তাই অযথা দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ করা জরুরি।

নিউরোসার্জেন ডা. প্রসাদ কৃষ্ণন