নয়াদিল্লি: ফরিদাবাদে কাশ্মীরি চিকিৎসকের ভাড়াবাড়িতে প্রচুর রাসায়নিক, এক্সপ্লোসিভ টাইমার, অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার। আর তার কয়েক ঘণ্টা পরই রাজধানী দিল্লির বুকে তীব্র বিস্ফোরণ। দুইয়ের মধ্যে কোনও সংযোগ আছে কি না, সেই নিয়ে তদন্ত চলছে। আর সেই আবহেই চাঞ্চল্যকর দাবি সামনে এল। বিস্ফোরণ ঘটাতে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট জ্বালানি তেল এবং অন্যান্য বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিক ভাবে অনুমান তদন্তকারীদের। ফলে পরিকল্পিত ভাবে বিস্ফোরণ ঘটানোর তত্ত্ব জোরাল হচ্ছে। (Ammonium Nitrate Fuel Oil)

Continues below advertisement

সোমবার সন্ধে ৬টা বেজে ৫২ মিনিটে কেঁপে ওঠে লালকেল্লা মেট্রো স্টেশন এলাকা। এখনও পর্যন্ত ন'জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে খবর মিলেছে। আহতের সংখ্য়া প্রায় ২০। টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে একাধিক গাড়ি। দিল্লি সীমানায়, ফরিদাবাদ থেকে ২৬০ কেজি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ও অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টার পরই দিল্লিতে গাড়ি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। দিল্লির বিস্ফোরণে তাই ফরিদাবাদ যোগ দেখছেন তদন্তকারীরা। 

যে গাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে, তার নম্বর প্লেটটি হরিয়ানার। গাড়ির মালিক হরিয়ানার বাসিন্দা মহম্মদ সলমনকে আটক করেছে পুলিশ। সলমন জানিয়েছেন, ওখলার বাসিন্দা, দেবেন্দ্র নামের একজনকে গাড়িটি বিক্রি করেন তিনি। তদন্তকারীরা জেনেছেন, পরে আম্বালার একজনের হাতে ওঠে গাড়িটি। অর্থাৎ বার বার হাতবদল হয় গাড়িটি, সন্ত্রাসী হামলার ক্ষেত্রেই সাধারণত এমনটা ঘটে।

Continues below advertisement

সোমবার লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরণস্থলে গিয়ে কোনও পেলেট বা শার্পনেল পাননি তদন্তকারীরা। মৃতদেহগুলিতেও শার্পনেল পাওয়া যায়নি বলে উঠে আসে। বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় এমনটা হওয়ার কথা নয়। আর সেই আবহেই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। কারণ সোমবারই ফরিদাবাদে কাশ্মীরি চিকিৎসকের ভাড়াবাড়ি থেকে ৩৫০ কেজি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ও অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার হয়। দিল্লি বিস্ফোরণের সঙ্গে তার যোগসূত্র থাকতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। 
 
অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট একটি গন্ধহীন, সাদা স্ফটিকাকার রাসায়নিক। এই রাসায়নিক অত্যন্ত শক্তিশালী অক্সিডাইজার, অর্থাৎ তা ব্যবহার করে বড় বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব। যে পরিমাণ রাসায়নিক উদ্ধার করা হয়েছে ফরিদাবাদে, তার সঙ্গে অন্যান্য বিস্ফোরক দ্রব্য মিশিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানো হলে ৫০ থেকে ১০০ মিটার এলাকায় সবকিছু ধুলোয় মিশে যেতে পারে।
 

এই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট আসলে লবণ, যা অ্যামোনিয়াম ও নাইট্রেটের আয়ন নিয়ে গঠিত। অ্যামোনিয়া ও নাইট্রিক অ্যাসিডের মধ্যে বিক্রিয়া ঘটে এক্ষেত্রে, যার দরুণ NH4N03 ফর্মুলা মেলে। উচ্চমাত্রায় অ্যামোনিয়াম ও নাইট্রেটের উপাদান মিশিয়ে সার তৈরি করা হয়। কারণ এটি এক ধরনের লবণ, যা জলে দ্রবণীয়। পৃথিবীর সিংহভাগ সারই নাইট্রেট নির্ভর। পাশাপাশি, এটি অক্সিডাইজারও, অর্থাৎ দহনে অক্সিজেন জোগায়।

অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ব্যবহার করে দুই ভাবে বিস্ফোরণ ঘটানো যায়, ১) আগুনের সংস্পর্শে বা অগ্নিকাণ্ডের সময় দাহ্য পদার্থের সঙ্গে মিশে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ২০২০ সালে লেবাননের বেইরুটে এক দরুণই ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ঘটে। ৩০০০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট পুড়ে বিস্ফোরণ ঘটে, যাতে ২০০-র বেশি মানুষ প্রাণ হারান। আহত হন প্রায় ৬০০০ মানুষ। একটি গুদামে মজুত করে রাখা ছিল অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট। ২০১৫ সালে চিনের তিয়ানজিনেও একই কারণে বিস্ফোরণ ঘটে। ৩৩ সেকেন্ডের ব্যবধানে দু'টি বিস্ফোরণে মারা যান ১৭৩ জন। আহত হন ৮০০-র বেশি মানুষ।

অন্য দিকে, বিস্ফোরক দ্রব্যের সঙ্গে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মিশিয়েও বিস্ফোরণ ঘটানো যায়। অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ও জ্বালানি তেল মিশিয়ে তৈরি বিস্ফোরককে বলা হয় ANFO. নির্মাণশিল্পে, খননকার্যে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে এভাবেই বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। তবে শুধুমাত্র NH4NO3-কে ধরলে, সেটি বিস্ফোরক নয়। উচ্চ তাপমাত্রা থেকে দূরে রাখলে তা থেকে বিপদ ঘটার সম্ভাবনা নেই। তবে ভুলভাবে মজুত করলে, তা থেকে বিপর্যয় ঘটতে পারে।

 ১৮৮৪ সালের বিস্ফোরক আইনকে সামনে রেখে ২০১২ সালে যে নীতি কার্যকর করা হয়, তার আওতায় যে কোনও মিশ্রণের মোট ওজনের ৪৫ শতাংশ যদি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট হয়, তা বিস্ফোরক হিসেবে গণ্য হবে। লাইসেন্স-প্রাপ্তরাই এই রাসায়নিক কিনতে বা ব্যবহার করতে পারেন। মজুত, পরিবহণ এবং বিক্রির ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলতে হয় সকলকে। বিদেশ থেকে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট আমদানি এবং বিদেশে তা রফতানিতেও কড়া নিয়মকানুন রয়েছে।