গত ডিসেম্বরে দেশজুড়ে বহু সংখ্যক বিমান বাতিল এবং দেরির ঘটনায় বড় পদক্ষেপ করল ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল এভিয়েশন বা ডিজিসিএ।  ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হল। ঘটনার তদন্তের পর ডিজিসিএ ইন্ডিগোকে মোট ২২.২০ কোটি টাকার জরিমানা করেছে। সেই সঙ্গে সংস্থার শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের সতর্ক করেছে। এবং ৫০ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি জমা করার নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়াও, যাত্রীদের ক্ষতিপূরণ এবং কোম্পানির সম্পূর্ণ অপারেশনাল সিস্টেমে উন্নতির জন্য কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

Continues below advertisement

গত ডিসেম্বরে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা দেখা যায় ইন্ডিগোর পরিষেবায়। সব মিলিয়ে ২হাজার ৫০৭টি বিমানের উড়ান বাতিল করা হয়। বাতিলের পাশাপাশি দেরিতেও ওড়ে ১ হাজার ৮৫২ টি বিমান।  উড়ান নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ইচ্ছাকৃত ভাবে ইন্ডিগোর কর্মীদের কাজের সময়সূচি এমন ভাবে নির্ধারণ করা হত, যাতে তাঁদের দিয়ে সবথেকে বেশি কাজ করানো যায়। এছাড়া 'কাজের সময় বাড়িয়ে দেওয়া, দীর্ঘক্ষণ একটানা ডিউটি, বিশ্রামের সময় না দেওয়া, এসব তো ছিলই। এসবের জেরে ধীরে ধীরে উড়ানসংস্থার গোটা পরিচালনা ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। তাই জরিমানার পাশাপাশি এই বিষয়গুলি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে সংস্থার সিইও এবং সিওও-কে। 

ডিজিসিএ-র রিপোর্ট অনুযায়ী, ৩ থেকে ৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে ইন্ডিগোর ২,৫০৭টি বিমান বাতিল করা হয়েছিল এবং ১,৮৫২টি বিমান দেরিতে চলেছে, যার ফলে তিন লক্ষেরও বেশি যাত্রী বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকে পড়েছিলেন। অসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রকের নির্দেশে গঠিত চার সদস্যের তদন্ত কমিটি নেটওয়ার্ক প্ল্যানিং, ক্রু রোস্টার, সফটওয়্যার সিস্টেম এবং ম্যানেজমেন্ট কাঠামোর গভীর তদন্ত করে। তারপরই উঠে আসে এই চরম অনিয়মের বিষয়টি। 

Continues below advertisement

তদন্তে কী জানা গেছে?

তদন্তে জানা যায়, ইন্ডিগো নতুন ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিট (এফডিটিএল) নিয়মগুলি সঠিকভাবে প্রয়োগ করেনি। ক্রু রস্টার এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সময় পাওয়া যায়নি। রিকভারি মার্জিন খুব কম রাখা হয়েছিল এবং বিমান ও কর্মীদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছিল। এর ফলে অপারেশনাল বাফার শেষ হয়ে যায় এবং সামান্য গোলযোগও বড় আকারে ফ্লাইট বাতিল ও দেরির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কমিটি আরও দেখেছে যে মুনাফা বাড়ানো এবং সম্পদের সর্বাধিক ব্যবহারের উপর প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক প্রস্তুতি দুর্বল হয়েছে। সফটওয়্যার এবং সিস্টেম সাপোর্টের দুর্বলতার কারণে রস্টার এবং নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল এবং ম্যানেজমেন্ট স্তরে সময় মতো  পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

ডিজিসিএ ইন্টারগ্লোব এভিয়েশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছে। সিইও-কে পুরো অপারেশন এবং আপতকালীন ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির জন্য কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। অ্যাকাউন্টটেবল ম্যানেজার অর্থাৎ সিওও-কে শীতকালীন সময়সূচী এবং সংশোধিত এফডিটিএল-এর প্রভাবের সঠিক মূল্যায়ন না করার কারণে সতর্ক করা হয়েছে। এছাড়াও ডেপুটি হেড ফ্লাইট অপারেশনস, ক্রু রিসোর্স প্ল্যানিং-এর এভিপি এবং ডিরেক্টর ফ্লাইট অপারেশনস-কে কর্মীদের কাজ করানোর পরিকল্পনা, রস্টার ম্যানেজমেন্ট এবং পর্যবেক্ষণে ত্রুটির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। 

ডিজিসিএ ইন্ডিগোকে ব্যবস্থা নেওয়ার রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে

ডিজিসিএ ইন্ডিগোকে নির্দেশ দিয়েছে যে অভ্যন্তরীণ তদন্তে যে সকল কর্মকর্তাদের ভূমিকা সামনে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়ে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য ডিজিসিএ ইন্ডিগোর উপর প্রতিদিন ৩০ লক্ষ টাকা হিসাবে ৬৮ দিনের পেনাল্টি দিয়েছে, যা মোট ২০.৪০ কোটি টাকা। এছাড়াও সিস্টেমের সঙ্গে জড়িত ত্রুটির জন্য ১.৮০ কোটি টাকার এককালীন জরিমানা করা হয়েছে। এইভাবে মোট জরিমানা হয়েছে ২২.২০ কোটি টাকা।

৫০ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টির নির্দেশ

শুধু জরিমানার মধ্যেই বিষয়টা সীমাবদ্ধ থাকেনি। ডিজিসিএ ইন্ডিগোকে ৫০ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি জমা করার নির্দেশ দিয়েছে, যা ‘ইন্ডিগো সিস্টেমেটিক রিফর্ম অ্যাসিওরেন্স স্কিম’-এর অধীনে রাখা হবে। যাত্রীদের স্বস্তি দিয়ে ডিজিসিএ আরও জানিয়েছে যে ৩ থেকে ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে যাদের ফ্লাইট তিন ঘণ্টার বেশি দেরি হয়েছে বা বাতিল হয়েছে, তাদের নিয়ম অনুযায়ী রিফান্ড ও ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি ১০,০০০ টাকার ‘জেসচার অফ কেয়ার’ ভাউচার দেওয়া হবে, যার মেয়াদ ১২ মাস হবে।