নয়াদিল্লি: অস্ত্রশস্ত্র ফেলে দলে দলে আত্মসমর্পণ। পাশাপাশি, ব্যাপক ধরপাকড় অভিযান চলছিল। এর দরুণ বেশ কয়েক মাস ধরেই নেতৃত্বসঙ্কটের কথা শোনা যাচ্ছিল। সেই অবস্থায় কার্যত একাহাতেই মাওবাদী কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছিল শীর্ষ মাওবাদী কমান্ডার মাড়বী হিডমা। কিন্তু মঙ্গলবার তার যাবতীয় কার্যকলাপে ইতি পড়ল। পুলিশি এনকাউন্টারে স্ত্রী এবং অনুগামী-সহ অন্ধ্রপ্রদেশের জঙ্গল থেকে উদ্ধার হল দেহ। (Madvi Hidma News)

Continues below advertisement

অন্ধপ্রদেশ-ছত্তীসগঢ় ও ওড়িশার সংযোগস্থলে, অন্ধ্রপ্রদেশের আল্লুরি সীতারামারাজু জেলায় মারেডুমিলী জঙ্গল থেকে মঙ্গলবার ৫১ বছর বয়সি হিডমার গুলিবিদ্ধ দেহ উদ্ধার হয়। স্ত্রী রাজে ওরফে রাজাক্কার দেহও মিলেছে জঙ্গল থেকেই। আরও চার জন ঘনিষ্ঠ সহযোগীর দেহ উদ্ধার হয়েছে। তাদের গতিবিধির উপর বেশ কিছুদিন ধরেই নজর ছিল গোয়েন্দাদের। শেষ পর্যন্ত জেলা পুলিশের রুদ্ধশ্বাস অভিযানে মিলল সাফল্য়। এদিন সকাল ৬টা থেকে ৭টার পর্যন্ত দুই পক্ষেপ মধ্যে গুলি চলে। শেষে হিডমা ও বাকিদের দেহ মেলে। (Madvi Hidma Killed)

পুলিশ জানিয়েছে, হিডমা ওরফে সন্তোষ, তার স্ত্রী এবং আরও চার মাওবাদী ছত্তীসগঢ় থেকে পালানোর চেষ্টা করছে বলে খবর ছিল তাদের কাছে। সেই মতো অভিযানে নেমে এদিন জঙ্গল ঘিরে ফেলা হয়। এতেই সংঘর্ষ শুরু হয় দুই পক্ষের মধ্যে। কিন্তু হিডমা জঙ্গলের কোথায় আছে, তা পুলিশ জানল কী করে? এ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতে আসছে। জানা যাচ্ছে, মে মাসে প্রথমে নাম্বালা কেশব রাও ওরফে বাসবরাজের মৃত্যু এবং অক্টোবরে মাল্লোজুলা বেণুগোপাল রাও ওরফে ভূপতির আত্মসমর্পণই হিডমার মর্মান্তিক পরিণতি নিশ্চিত হয়ে যায়।

Continues below advertisement

২০২১ সালে চরম বাম উগ্রপন্থার পতনের সূচনা ঘটে মিলিন্ত তেলতুম্বড়ের মৃত্যু দিয়ে। তিনি CPM Maoist-এর সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য ছিলেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ‘নকশালমুক্ত ভারত’ গঠনের ঘোষণা করে দেন এর পরই। সেই থেকে দলে দলে মাওবাদীরা আত্মসমর্পণ করতে শুরু করেন। তবে কেন্দ্রের ঘোষণায় ভয় পেয়ে বা পুলিশ ও সেনার অভিযানে মারা যাওয়ার ভয়ে নয়, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং সশস্ত্র বিপ্লব নিয়ে মোহভঙ্গ হওয়ার দরুণই। 

আত্মসমর্পণের পর পুলিশকে মাওবাদীরা যে তথ্য দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর ৬০ ক্যাডার-সহ বাসবরাজের মৃত্যুর পর থেকেই পারস্পরিক বোঝাপড়ায় ফাটল ধরে, নেতৃত্বসঙ্কট দেখা দেয়। বাসবরাজের পর, বেণুগোপাল ওরফে ভূপতিকেই সকলে আদর্শবাদী নেতা হিসেবে দেখতে শুরু করে। কিন্তু বাসবরাজের মৃত্যুর পর ভূপতি সশস্ত্র সংগ্রামে সাময়িক বিরতি ঘোষণা করে। পরে অনুগামীদের নিয়ে আত্মসমর্পণের রাস্তা বেছে নেয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে মাওবাদী সংগঠনে খামতি, বিভাজনের কথা তুলে ধরে। মানুষের সমর্থনও যে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, স্বীকার করে নেয়। 

জানা গিয়েছে, ভূপতি সরকারের সঙ্গে সমঝোতার প্রস্তাব দিলে সেই বিভাজন আরও চওড়া হয়। হিডমা এবং তার অনুগামীরা সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিতে উদ্যোগী হয়। ভূপতি আত্মসমর্পণ করার পরই হিডমাকে নাগালে পাওয়ার চেষ্টায় নেমে পড়েন গোয়েন্দারা। সেই কাজে তাঁদের সাহায্য় জোগায়, হিডমার একদা বিশ্বস্ত, People’s Liberation Guerrilla Army-র ১ নং ব্যাটেলিয়নের সদস্য ওয়াম লখমু। অক্টোবরেই আত্মসমর্পণ করে সে। ২৫০ ক্যাডারকে নিয়ে হিডমা তেলঙ্গানায় ঢুকেছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে খোলসা করে সে। 

এর পরই জোর কদমে হিডমার খোঁজে নেমে পড়ে নিরাপত্তা বাহিনী থেকে গোয়েন্দাদল। এদিন আচমকা পুলিশ জঙ্গল ঘিরে ফেলায় সে বিভ্রান্ত হয়ে যায় এবং সেই সুযোগেই তাকে নিকেশ করা সম্ভব হয় বলে জানা গিয়েছে। দণ্ডকারণ্য-সাউথ বাজার জোনের সবচেয়ে দক্ষ যোদ্ধা হিসেবে মাওবাদীদের মধ্যে পরিচিত ছিল হিডমা। বিভিন্ন রাজ্য মিলিয়ে তার মাথার দাম ছিল  ১ কোটি টাকার বেশি। ২০১০ সালে দান্তেওয়াড়া হামলা থেকে কমপক্ষে ২৬টি প্রাণঘাতী হামলার চক্রী হিসেবে চিহ্নিত হিডমা। কিন্তু ২০২৫ সালেই ১৩০০-র বেশি মাওবাদী আত্মসমর্পণ করে। এবছরই সেনা ও পুলিশি অভিযানে ৩০০-র বেশি মাওবাদী মারা যায়। ফলে ব্যাপক শক্তিক্ষয় হয় হিডমার। তার এই পরিণতিতে মাওবাদীরাও জোর ধাক্কা খেল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।