নয়াদিল্লি: মেলাপ্রাঙ্গনে পদপিষ্ট হয়ে ৩৩ জনের মৃত্যুর পর একমাসও কাটেনি। ফের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেল। নয়াদিল্লি রেল স্টেশনে হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হল কমপক্ষে ১৮ জনের। মৃতদের মধ্যে ১১ জন মহিলা, চার শিশু। মহাকুম্ভে যাওয়ার হিড়িকে হুড়োহুড়ি পড়ে যায় স্টেশনে, আর তার জেরেই এতজনের প্রাণ যায় বলে জানা গিয়েছে। নয়াদিল্লি স্টেশনেই মৃত্যু হয় ১০ মহিলা, দুই পুরুষ এবং তিন শিশুর। বাকি তিনজনের মৃত্যু হয় লেডি হার্ডিং হাসপাতালে। প্রথমে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনাই অস্বীকার করে রেল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বলে জানান রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। কিন্তু ঘটনাস্থল থেকে যে দৃশ্য সামনে আসে, যে বর্ণনা দিতে শুরু করেন পুণ্যার্থীরা, তাতে শেষ পর্যন্ত ঘটনার কথা স্বীকার করে নেওয়া হয়।

গত ২৯ জানুয়ারি উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে কুম্ভমেলা প্রাঙ্গনে পদপিষ্ট হয়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। সরকারি ভাবে হতাহতের সংখ্য়া ৩৩ বলে জানানো হলেও, সংখ্যাটা আরও বেশি বলে দাবি সামনে এসেছে। কিন্তু তার পরও কুম্ভমেলাকে ঘিরে হুড়োহুড়ি থামেনি। গত কয়েক দিনে উত্তরপ্রদেশ, বিহার থেকে এমন একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে প্রয়াগরাজগামী ট্রেনে ওঠা নিয়ে ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি দেখা গিয়েছে। এমনকি ট্রেনের জানলা ভেঙেও ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন কেউ কেউ। 

শনিবার রাতে নয়াদিল্লি স্টেশনেও ভিড় থিকথিক করছিল। ১৪ এবং ১৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রয়াগরাজগামী ট্রেনে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছিলেন কাতারে কাতারে মানুষ। ১৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রয়াগরাজ এক্সপ্রেস এসে দাঁড়ায়। ১৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ায় স্বতন্ত্র সেনানী এক্সপ্রেস। ভুবনেশ্বর-রাজধানী এক্সপ্রেস দেরিতে চলছিল। প্রয়াগরাজগামী দু'টি ট্রেনে উঠতে হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষা করছিলেন। শুধু ১৪ এবং ১৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মেই নয়, ১২ এবং ১৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েও অপেক্ষা করছিলেন বহু মানুষ। রেল সূত্রে খবর, এক ঘণ্টায় ১৫০০-র বেশি জেনারেল টিকিট বিক্রি হয়েছিল। কনফার্ম টিকিট না থাকলেও উঠে পড়তে বলা হয় ট্রেনে। অথচ সংরক্ষিত আসনের টিকিট কেটেও ট্রেনে উঠতে পারেননি বহু যাত্রী।

সেই অবস্থায় রাত ৯টা নাগাদ পরিস্থিতি হাতের বাইরে বেরিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে যে ছবি এবং ভিডিও সামনে এসেছে, তাতে ট্রেনে ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি করতে দেখা যায় হাজার হাজার মানুষকে। শিশুদের কাঁধে বসিয়ে ছোটাছুটি করছিলেন কেউ কেউ। কেউ কেউ আবার মাথায় মালপত্র নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। ট্রেনের দরজায় ঝুলতে দেখা যায় মানুষজনকে। মূলত ১৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম এবং ১ নম্বর প্ল্যাফর্মের এসক্যালেটরের কাছে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। ঘটে যায় অঘটন। এক প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, "ভিড় সামাল দেওয়ার জন্য কেউ ছিল না। ১২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন আসার কথা ছিল। হঠাৎ ঘোষণা হয়, ১২-র পরিবর্তে ১৬ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকছে। ব্যাস সঙ্গে সঙ্গে দু'দিক থেকে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়।" আর এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, স্টেশনে রেল পুলিশ বা এমনি পুলিশ, কেউ ছিল না। ভিড় উপচে পড়ছিল। বহু মানুষ আহত হয়েছেন।

রেল আধিকারিকদের দাবি, ভিড় সামাল দিতে অতিরিক্ত বাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু ঘটনাস্থল থেকে যে ছবি এবং ভিডিও সামনে এসেছে, তাতে বেসামাল ভিড়কে উদভ্রান্তের মতো ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করতে দেখা যায়। ভোররাতে স্টেশন থেকে যে ছবি এবং ভিডিও সামনে এসেছে, তাতে জামাকাপড়ের টুকরো, জুতো, চপ্পল ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছে স্টেশনে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছিলেন। সেই আবহে প্রয়াগরাজ গামী ট্রেন দু'টি দেরিতে চলছিল। ট্রেন এসে পৌঁছতেই হুড়োহুড়ি পড়ে যায়।

মনোজ শাহ নামের এক ব্যক্তি নিজের কন্যা, শ্বশুর এবং শ্বাশুড়িকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, "শ্যালক হঠাৎ ফোন করে আমাকে। বলে, 'এখানে হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছে। মানুষজন একে অপরকে মাড়িয়ে চলে যাচ্ছে'।" মনোজ জানিয়েছেন, তাঁর মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। দাদু-দিদার সঙ্গে কুম্ভমেলায় যাচ্ছিল। রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, অত্যধিক ভিড় জমা হয় স্টেশনে। সেই সময় পদপিষ্ট হওয়ার গুজবও ছড়ায়। প্রাণে বাঁচতেও এদিক ওদিক ছুটতে শুরু করেন অনেক, তা থেকেই এত বড় ঘটনা ঘটে যায়।

আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বলে যদিও জানিয়েছে রেল। কিন্তু গোটা ঘটনায় ফের একবার কুম্ভমেলার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল। সোশ্যাল মিডিয়া সেই নিয়ে সরব হয়েছে কংগ্রেস। তাদের বক্তব্য, 'মহাকুম্ভে যাওয়ার পথে পুণ্যার্থীদের মৃত্যুর ঘণ্টা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। মোদি সরকারের উচিত পরিবারেরক হাতে দেহ তুলে দেওয়া, সকলকে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করা। মহাকুম্ভ চলছে বলে জানে সরকার। তার পরও কেন বাড়তি ট্রেনের ব্যবস্থা করা হল না? ভিড় সামলাতে স্টেশনে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হল না কেন'? 

দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অতিশী লেখেন, ''মহাকুম্ভ-গামী পুণ্যার্থীদের সঙ্গে এমন ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। না কেন্দ্রীয় সরকার, না উত্তরপ্রদেশ সরকার, তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ ভাবিত নয়'। রাতে হাসপাতালেও ছুটে যান অতিশী। জানা গিয়েছে, দিল্লির লোক নায়ক হাসপাতালে আহতদের নিয়ে যাওয়া হয়। মধ্যরাতে সেখানে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়। মর্গের ধারেকাছে কাউকে ঘেঁষতে দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ। গুরুগ্রামের বাসিন্দা কমলেশ কুমারী ঝাঁসি যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, "আমি সিঁড়ির উপর ছিলাম। হঠাৎই একে অপরের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে শুরু করেন সকলে। বুঝতেও পারিনি কী ঘটছে।" কমলেশ পিঠে, কোমরে আঘাত পেয়েছেন। টাকার ব্যাগ, জিনিসপত্র হারিয়ে গিয়েছে তাঁর। আমন গিরি নামের ২২ বছরের এক তরুণ জানিয়েছেন, পদপিষ্ট হয়ে মারা গিয়েছেন তাঁর মা। আমনের বক্তব্য, "আমি অনেক বারণ করেছিলাম। বলেছিলাম, যেও না।" আমনের বাবা আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। আমন জানিয়েছেন, মায়ের চেহারা ভারী ছিল। সকলের সিঁড়ির দিকে ছুটলেও, তিনি পারেননি। তাঁকে মাড়িয়ে চলে যান অনেকে।

সঞ্জয় নামের এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ১২ জন মিলে কুম্ভমেলায় যাচ্ছিলেন তাঁরা। প্ল্যাটফর্মে পৌঁছতেও পারেননি তাঁরা। সিঁড়ির উপর আটকে যান। তাঁর বোন ভিড়ের মধ্যে পদপিষ্ট হন। যত ক্ষণে বোনের কাছে পৌঁছন, তত ক্ষণে সব শেষ।