নয়াদিল্লি: সমাজ সংস্কারক, নবজাগরণের পথিকৃৎ হিসেবেই এতদিন তাঁকে চিনে এসেছে গোটা দেশ। সতীদাহ প্রথা বিলোপ থেকে নারীশিক্ষার প্রসার, বিধবা বিবাহেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাঙালির গর্ব সেই রাজা রামমোহন রায়কে ‘ইংরেজদের দালাল’ বলে দাগিয়ে দিলেন মধ্যপ্রদেশের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী তথা বর্ষীয়ান বিজেপি নেতা ইন্দ্র সিংহ পারমার। (Ram Mohan British Agent Remarks)
মধ্যপ্রদেশের আগর মালওয়াতে বিরসা মুন্ডার ১৫০তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন হয়েছিল। সেখানে বক্তৃতা করতে গিয়েই এমন মন্তব্য় করেন ইন্দ্র সিংহ। তাঁর দাবি, কিছু ভুয়ো সমাজ সংস্কার ইংরেজদের দালাল হিসেবে কাজ করছিলেন। সাধারণ মানুষের ধর্মান্তরণ চলছিল সেই সময়। সেই ধর্মান্তরণ আটকানোর চেষ্টা করেছিলেন বিরসা মুন্ডা। (Inder Singh Parmar)
ইন্দ্র সিংহের বক্তৃতার যে ভিডিও সামনে এসেছে, তাতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “বাংলা…ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে দেশের মানুষের আস্থা বদলানোর দুষ্কর্ম চলছিল। দেশের কিছু মানুষকে ভুয়ো সমাজ সংস্কারক বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল ইংরেজরা, যার মধ্যে রাজা রামমোহন রায়ও শামিল ছিলেন। উনিও ইংরেজদের দালাল হিসেবেই কাজ করছিলেন দেশে। ধর্মান্তরণের যে কুচক্র চালিয়েছিলেন, তা আটকানোর সাহস যদি কেউ দেখিয়ে থাকেন, তিনি ছিলেন বিরসা মুন্ডা। আদিবাসী সমাজকে বাঁচিয়েছিলেন তিনি।”
ইন্দ্র সিংহ দাবি করেন, ইংরেজদের জমানায় মিশনারি স্কুলের মাধ্যমে ধর্মান্তরণের কুচক্র চালানো হতো। ইংরেজদের সমর্থন করতেন কিছু মানুষ। সমাজ সংস্কারের নামে তাঁরা ধর্মান্তরণের কাজে যুক্ত ছিলেন। বিরসা মুন্ডা আদিবাসী সমাজের সংস্কৃতি ও পরিচয় বাঁচানোর লক্ষ্য়ে নিজের প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দেন। মন্ত্রী আরও দাবি, বিরসা মুন্ডা মিশনারি স্কুলে পড়তে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু গতিবিধি বুঝতে পেরে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন।
কেন্দ্রের প্রাক-বিজেপি সরকার প্রকৃত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ইতিহাস ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ তোলেন ইন্দ্র সিংহ। তাঁর দাবি, আদিবাসী নায়ক ও স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেওয়া নেতাদের ইতিহাস ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। পরিবর্তে ইংরেজদের হয়ে ধর্মান্তরণের রাস্তা সহজ করে তোলা লোকজনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২৫ সালটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন ইন্দ্র সিংহ। তাঁর দাবি, এই বছরই বিরসা মুন্ডা, সর্দরা বল্লভভাই পটেলের ১৫০তম জন্মজয়ন্তী, আর এই বছরই ‘বন্দে মাতরম’ গানটির ১৫০তম পূর্তি।
রাজা রামমোহন রায়কে নিয়ে ইন্দ্র সিংহের এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা করেছে কংগ্রেস। দলের মুখপাত্র ভূপেন্দ্র গুপ্ত বলেন, “ইন্দ্র সিংহ পারমারের এই মন্তব্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। ওঁর ইতিহাস জ্ঞান নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।” রামমোহন যে সতীদাহ প্রথা বিলোপ করেছিলেন, তাও কি ইংরেজদের ‘কুকর্ম’ বলে মনে করে বিজেপি, প্রশ্ন তোলেন ভূপেন্দ্র। একসময় যারা ইংরেজদের দালাল হিসেবে কাজ করেছিল, আজ তারা যা ইচ্ছে তাই বলে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে এই প্রথম বার নয়। এমন মন্তব্যের জেরে আগেও বিতর্কে জড়িয়েছেন ইন্দ্র সিংহ। ভাস্কো ডা গামা নন, চন্দন নামের এক বাণিজ্যিক ভারত আবিষ্কার করেন, ভুল ইতিহাস পড়ানো হয়েছে বলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দাবি করেন তিনি। শুধু তাই নয়, মধ্যপ্রদেশে উচ্চশিক্ষা বিভাগের দায়িত্ব পেয়ে সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি কলেজের গ্রন্থাগারে আটটি বই রাখার নির্দেশ দেন তিনি, যার অধিকাংশই RSS-এর সঙ্গে যুক্ত লোকজনের লেখা। ওই আটটি বইয়ের মধ্যে তিনটিরই লেখক প্রাক্তন RSS নেতা সুরেশ সোনির। স্কুল শিক্ষা বিভাগের মন্ত্রী থাকাকালীনও বার বার বিতর্কে জড়ান ইন্দ্র সিংহ।