নয়াদিল্লি: যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। সেই আবহেই গণহত্যার ঘটনা সামনে এল সুদান থেকে। হাসপাতালে ঢুকে রোগী এবং রোগীর আত্মীয়দের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে বলে জানা গেল। হাসপাতালে ভর্তি কমপক্ষে ৪৬০ জন রোগী মারা গিয়েছেন এই ঘটনায়। মৃত্যু হয়েছে তাঁদের আত্মীয়-স্বজনদের। দেশের আধা সামরিক বাহিনী, Rapid Support Forces-ই এই গণহত্যা ঘটিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। (Sudan Hospital Killing)
রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বাস্থ্য় সংস্থা এই তথ্য সামনে এনেছে। তাদের দাবি, সম্প্রতি সুদানের নর্থ ডরফর অঞ্চলটি দখল করে দেশের আধা সামরিক বাহিনী RSP. এর পরই, আল-ফাশের শহরে সৌদি আরবের সাহায্যপ্রাপ্ত ওই মেটারনিটি হাসপাতালে ঢুকে পড়ে সৈনিকদের একাংশ। ঠান্ডা মাথায় নিরীহ নাগরিকদের হত্যা করে তারা। মঙ্গলবার এই গণহত্যা চালানো হয় বলে জানা গিয়েছে। (Sudan Civil War)
সুদান ডক্টর্স নেটওয়র্ক জানিয়েছে, একেবারে ঠান্ডা মাথায় শত শত মানুষকে খুন করেছে RSF. রোগী, রোগীর পরিবার, কাউকে বাদ দেয়নি দেশের সমস্ত চিকিৎসা পরিষেবা কেন্দ্র এই মুহূর্তে কসাইখানায় পরিণত হয়েছে। এমনকি ছয় চিকিৎসককেও অপহরণ করা হয়েছে, বিনিময়ে প্রায় ১.৫ লক্ষ ডলার মুক্তিপণ চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাসচিব টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসাস এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন।
কোনও রকমে প্রাণ বাঁচিয়ে যাঁরা পালিয়ে এসেছেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বাস্থ্যকর্মী থেকে সাধারণ নাগরিক, তাঁরা ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন। জানিয়েছেন, শনিবার থেকেই গোলাগুলির তীব্রতা বাড়ছিল। আল-ফাশের ছেড়ে পালিয়ে আসা ছাড়া উপায় ছিল না। RSF যাঁদের নাগালে পায়, তাঁদের বেধড়ক মারধর করে, অত্যাচারের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দিও করে রাখা হয়। সমস্ত টাকাপয়সা, মূল্যবান জিনিস কেড়ে নেওয়া হয়। বহু মানুষকে পণবন্দি করে রেখে চাওয়া হয় মুক্তিপণ। বন্দিদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে খুনও করা হয়। না খেয়ে, তৃষ্ণার্ত অবস্থায় কোনও রকমে পালিয়ে আসেন কেউ কেউ।
রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবিক কাজকর্ম বিভাগের এক আধিকারিক বলেন, “পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। তার উপর আবার গণহত্যা। মাসের পর মাস ধরে কী নৃশংসতা চলছে। অনাহারে দিন কাটছে মানুষের। ন্যূনতম স্বাস্থ্য পরিষেবাটুকু নেই। এই মুহূর্তে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জায়গা হয়ে উঠেছে সুদান। সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে সেখানে। অথচ কারও মুখে সেই নিয়ে কথা নেই।”
গত দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে সুদানে। সুদানের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, সেই নিয়েই লড়াই মূলত। এই দু’বছরের সময়কালে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন সেখানে। যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, আসলে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি। দেশের ১ কোটি ৪০ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে দেশে। পরিস্থিতি এমন যে আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্তম দেশটিতে ফের ভাঙন ধরতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সুদানে সামরিক বাহিনী এবং আধাসেনা RSP-র মধ্যেই মূলত সংঘর্ষ চলছে। রাজধানী খারতুম ইতিমধ্যেই তছনছ হয়ে গিয়েছে। সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা রাজধানী দখল করেছে। কিন্তু RSP দরফর, কোরদোফানের মতো অঞ্চল দখল করে রেখেছে। লাগাতার শক্তিবৃদ্ধি করছে তারা। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে দুই পক্ষের মধ্যে। আর দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে গণহত্যা, নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালানো এবং নির্দিষ্ট একটি জাতির মানুষকে নিকেশ করে দেওয়ার অভিযোগ তুলছে। শুধু তাই নয়, শিশু থেকে সাধারণ নাগরিকদের উপর দেদার যৌন নির্যাতনের ঘটনাও সামনে আসছে লাগাতার।
এই গৃহযুদ্ধের জেরেই ২০১১ সালের ৯ জুলাই সুদান দুই ভাগে ভেঙে যায়, জন্ম হয় খনিজ তেলে সমৃদ্ধ সাউথ সুদানের। সেই ভাঙনের নেপথ্যে ছিল কয়েক দশকের ধর্মীয়, জাতিগত এবং রাজনৈতিক সংঘাত। আবারও তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে বলে মত কূটনীতিকদের একাংশ। তবে সুদানের এই গৃহযুদ্ধে আরব দেশগুলির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং সৌদি আরব, দুই দেশের ভূমিকা রয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সুদানের রাজনীতিতে নাক গলানো বেড়ে যায় তাদের। সাহেল এবং লোহিত সাগরের মাঝে অবস্থিত সুদানে জলের ঘাটতি নেই, কমতি নেই উর্বর জমির।
২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সঙ্কটের পর, খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিতকরণে সুদানের উপর নজর পড়তে শুরু করে আরব দেশগুলির। ২০১১ সালে আরব বসন্তের পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং সৌদি কার্যতই ঝাঁপিয়ে পড়ে সুদানে। ১৯৫৬ সাল থেকে সুদানের সঙ্গে রাজনৈতিক সখ্য ছিল সৌদির। ইয়েমেনের হুথি-কে রুখতে সৌদিকে ৪০ হাজার সৈনিক পর্যন্ত জোগায় সুদান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সংযুক্ত আমিরশাহিও সুদানের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। সেখানে বিনিয়োগ শুরু করে তারা। এই মুহূর্তে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিই RSF-কে অস্ত্রশস্ত্র, খাবার, চিকিৎসা সরঞ্জাম জোগাচ্ছে বলে খবর।