নয়াদিল্লি: উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে রুদ্ধশ্বাস অভিযান। রাশিয়ার পতাকা লাগানো তেলের ট্যাঙ্কার তাড়া করে, সেটিকে বাজেয়াপ্ত করল আমেরিকা।গত দু'সপ্তাহ ধরেই জাহাজটিকে অনুসরণ করছিল আমেরিকা। কিন্তু বার বার হাত ফস্কে বেরিয়ে যাচ্ছিল। আমেরিকার নজর এড়াতে যদিও চেষ্টায় কোনও খামতি রাখেনি জাহাজটি। নাম পরিবর্তন, পতাকা পরিবর্তন, সব চেষ্টাই হয়। কিন্তু বুধবার শেষ পর্যন্ত জাহাজটি বাজেয়াপ্ত করে আমেরিকা। (US-Russia Conflict)
বুধবার আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তরে, উত্তর সাগরে 'মারিনেরা' (Marinera) নামের জাহাজটিকে বাজেয়াপ্ত করে আমেরিকা। তাড়া করে গিয়ে সেটির দখল নেয় তারা। জানা গিয়েছে, ভেনিজুয়েলা থেকে ওই জাহাজে করে ইরান এবং রাশিয়ায় তেল সরবরাহ হতো। আমেরিকা আগেই নিষিদ্ধ করেছিল জাহাজটিকে। (Russian Flagged Ship Seized by US)
ব্রিটেন-আইসল্যান্ড-গ্রিনল্যান্ড করিডরে জাহাজটিকে বাজেয়াপ্ত করা হয় বলে জানা গিয়েছে। এব্যাপারে আমেরিকাকে সাহায্য় জোগায় ব্রিটেনও। রাশিয়ার তরফে একটি সাবমেরিনও নামানো হয়েছিল জাহাজটিকে নিরাপত্তা দিতে। কিন্তু সেই সাবমেরিন পিছিয়ে পড়েছিল বলে খবর। তাই আমেরিকা জাহাজটি বাজেয়াপ্ত করলেও দুই পক্ষের মধ্যে কোনও সংঘর্ষ হয়নি বলে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। রাশিয়ার পতাকা লাগানো কোনও জাহাজ আমেরিকা সাম্প্রতিক কালে বাজেয়াপ্ত করেছে বলে স্মরণ করতে পারছেন না কেউ।
জানা গিয়েছে, গত নভেম্বর মাসে ইরান থেকে যাত্রা শুরু করে জাহাজটি। ওমান উপসাগর ছেড়ে এগোতে শুরু করে। সুয়েজ খাল থেকে জিব্রাল্টার প্রণালী হয়ে ডিসেম্বরের শুরুতে আটলান্টিকে প্রবেশ করে 'মারিনেরা'। ভেনিজুয়েলার উপর আমেরিকা যখন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করছে, সেই সময় জাহাজটি ভেনিজুয়েলাতেই তেল আনতে যাচ্ছিল।
গত ২১ ডিসেম্বর আমেরিকার উপকূলরক্ষী বাহিনী ক্যারিবিয়ান সাগরে জাহাজটির পথ আটকায়। সেই সময়ও জাহাজটির নাম ছিল Bella-1. আমেরিকার কাছে সেই সময় জাহাজ বাজেয়াপ্ত করার ওয়ারেন্টও ছিল। জাহাজটিতে তখনও কোনও দেশের পতাকা লাগানো ছিল না। কিন্তু জাহাজের কর্মীরা আমেরিকার উপকূলরক্ষী বাহিনীকে উঠতেই দেননি। এর পর জাহাজটি আটলান্টিকের উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করে।
লাগাতার জাহাজটির উপর নজরদারি চালাচ্ছিল আমেরিকা। সেই পরিস্থিতিতে জাহাজের হালের উপর রাশিয়ার পতাকা এঁকে দেওয়া হয়। কারণ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, জাহাজে যে দেশের পতাকা আঁকা থাকবে, সেই দেশই জাহাজকে নিরাপ্ততা দিচ্ছে বলে ধরে নেওয়া হয়। এর পর পরই Bella 1 থেকে নাম পাল্টে 'মারিনেরা' করে নেওয়া হয়। রাশিয়ার শিপিং রেজিস্ট্রিতে জাহাজটির নাম নথিভুক্ত করা হয়। জাহাজটির বন্দর হিসেবে চিহ্নিত হয় কৃষ্ণসাগরের সোচি।
এর পর কূটনীতিকদের মাধ্যমে রাশিয়ার তরফে আমেরিকাকে অনুরোধ জানানো হয় জাহাজটিকে ধাওয়া না করতে। বর্ষবরণের রাতেই সেই মর্মে অনুরোধ এসে পৌঁছয় আমেরিকার বিদেশমন্ত্রকের কাছে। আমেরিকা যদিও রাশিয়ার সেই অনুরোধে সাড়া দেয়নি। জাহাজটি নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেছে, ইরানের তেল সরবরাহ করেছে বলে জানিয়ে দেয় তারা।
এর পর ভেনিজুয়েলার উপর আমেরিকার চাপ যখন বাড়ছে, সেই অবস্থায় রুট পরিবর্তন করে জাহাজটি। গত ১৫ ডিসেম্বর ক্যারিবিয়ানের কাছে কিছু ক্ষণ দাঁড়িয়ে পড়ে। তার পর আবার ইউরোপ অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। সেই সময়ই ভেনিজুয়েলার তেলের ট্যাঙ্কারগুলির বিরুদ্ধে 'টোটাল ক্র্যাকডাউন' ঘোষণা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমতাবস্থায় জাহাজটিকে রক্ষা করতে রাশিয়ার নৌবাহিনী একটি সাবমেরিন নামায় আটলান্টিকে। সেটি নিরাপত্তা দিতে দিতে জাহাজটিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য় করে।
জাহাজটি বাজেয়াপ্ত করার আগে একাধিক হেলিকপ্টার ও বিমান পাঠায় আমেরিকা। জাহাজটির উপর চক্কর দেয় সেগুলি। আইসল্যান্ডে আমেরিকার সেনাঘাঁটি থেকেও একটি যুদ্ধবিমান আটলান্টিকে চক্কর দিতে শুরু করে। RAF Rivet Joint, ব্রিটেন থেকে P-8 Poseidon বিমানও নামে, যারা সাবমেরিনের উপর নজরদারি চালাতে দক্ষ।
বুধবার শেষ পর্যন্ত জাহাজটিতে উঠতে সফল হয় আমেরিকার উপকূলরক্ষী বাহিনী। উত্তর আটলান্টিকে জাহাজটিকে বাজেয়াপ্ত করে তারা। নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের জন্যই জাহাজটিকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে জানায় আমেরিকার সেনা। আমেরিকার প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ জানান, ভেনিজুয়েলার তেল এবং আগের সব নিষেধাজ্ঞা পৃথিবীর সর্বত্র কার্যকর রয়েছে।
যদিও রাশিয়ার দাবি, জাহাজটি বাজেয়াপ্ত করে আমেরিকা রাষ্ট্রপুঞ্জের 'সাগর আইন' লঙ্ঘন করেছে। অন্য রাষ্ট্রের এক্তিয়ারের অন্তর্ভুক্ত কোনও জাহাজের উপর বলপ্রয়োগ করা যায় না। এর পাল্টা আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের যুক্তি তুলে ধরেছে।
তবে রাশিয়ার পতাকা লাগানো যেভাবে বাজেয়াপ্ত করেছে আমেরিকা, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকার দাবি, জাহাজটি রাশিয়ার 'শ্যাডো ফ্লাইটে'র অংশ। রাশিয়া, ইরান এবং ভেনিজুয়েলার জন্য তেল বহন করত সেটি। হেজবোল্লার একটি সংস্থার জন্য বেআইনি রসদ সরবরাহের জন্য ২০২৪ সালে নিষিদ্ধ করা হয় জাহাজটিকে। সেই সময় জাহাজটির মালিকানা ছিল তুরস্কের সংস্থা Louis Marine Shipholding Enterprises SA-র নামে। ওই সংস্থার সঙ্গে আবার ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ডস কর্পসের সংযোগ পাওয়া যায়।
আমেরিকার সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর, বুধবার যখন জাহাজটিকে বাজেয়াপ্ত করা হয়, সেটি খালিই ছিল। কিন্তু তাহলে কেন রাশিয়া নিরাপত্তা দিচ্ছিল জাহাজটিকে, উঠছে প্রশ্ন।