কিভ:  রুশ (Russia Ukraine War) সেনার হাতে পারমাণবিক কেন্দ্রের (Chernobyl Nuclear Power Plant) দখল ওঠার পর থেকেই বায়ুমণ্ডলে তেজক্রিয়তার মাত্রা বাড়ছে বলে দাবি করছিল তারা। এ বার চেরনোবিল নিয়ে আরও চাঞ্চল্যকর দাবি করল ইউক্রেন সরকার। তাদের দাবি, অসুস্থ অবস্থায় চেরনোবিল পারমাণবিক কেন্দ্র ছাড়তে হয়েছে রুশ সেনাকে। তেজস্ক্রিয় বিকিরণে দীর্ঘ দিন থাকতে থাকতেই তারা অসুস্থ হবয়ে পড়ে এবং শেষমেশ পিছু হটে বলে দাবি কিভের। একই সঙ্গে পণবন্দি করে রাখা চেরনোবিলের ইউক্রেনীয় কর্মীদেরও রুশ সেনা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।


চেরনোবিলে তেজস্ক্রিয় বিকিরণে অসুস্থ রুশ সৈনিকরা, দাবি কিভের


ইউক্রেনের পরমাণু সংস্থা ‘এনারগোটম’  জানিয়েছে,  চেরনোবিল সংলগ্ন জঙ্গলে পরিখা খনন করে রুশ সেনা। তার পর থেকেই একে একে রুশ সৈনিকরা (Russian Army) অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকেন। তাতেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়। সংস্থার তরফে আরও বলা হয়, “চেরনোবিল থেকে পালানোর সময় রুশ হামলাকারীরা ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে, যাদের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে পণবন্দি করে রাখা হয়েছিল।”


ইউক্রেনের উপ প্রধানমন্ত্রী ইরিনা ভেরেশ্চুকও তেজস্ক্রিয় বিকিরণে রুশ বাহিনীর অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, পরিখা খননে হাত লাগিয়েছিলেন যাঁরা, তেজস্ক্রিয় বিকিরণের সংস্পর্শে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরমাণু কেন্দ্র এলাকায় ট্যাঙ্ক ঢোকানোয় তেজস্ক্রিয় ধুলো মাটি থেকে উপরে উঠে বাতাসে মিশে যায়। এতেই রুশ সৈনিকরা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং বেলারুশের একটি শিবিরে তাঁদের চিকিৎসা চলছে বলেও দাবি করা হয়েছে।


আরও পড়ুন: Russian Foreign Minister in India : ইউক্রেনে-আগ্রাসনের আবহেই চিন সফর সেরে ভারতে রাশিয়ার বিদেশমন্ত্রী


এখনও পর্যন্ত এ নিয়ে নিশ্চিন্ত ভাবে কিছু বলা না গেলেও, ইউক্রেনের দাবি খতিয়ে দেখছে নজরদারি সংস্থা। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিল এনার্জি এজেন্সি (IAEA) জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ইউক্রেনের দাবির সপক্ষে কিছু মেলেনি। স্বাধীন ভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে তারা। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের বিশেষজ্ঞ দল চৈরনোবিল পৌঁছচ্ছে বলে জানিয়েছে IAEA।


গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদামির পুতিন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আর যুদ্ধের প্রথম দিনই চেরনোবিল দখল করে রুশ সেনা। যদিও সেখানে কর্মরত ইউক্রেনীয় নাগরিকদের যদিও কাজ চালিয়ে যেতে অনুমতি দেওয়া হয়। পরমাণু কেন্দ্রের নিরাপত্তা  জন্যই তাঁদের কাজ চালিয়ে যাওয়ায় অনুমতি দেয় রাশিয়া। যদিও চেরনোবিলের কর্মীদের পণবন্দি করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করে ইউক্রেন।


চেরনোবিলের দখল ছাড়ল রাশিয়া


এর পর চলতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ইউক্রেন জানায়, রুশ সেনা চেরনোবিল ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। চেরনোবিল এবং সংলগ্ন এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত দেশের সরকারি বিভাগ জানায়, চেরনোবিল পরমাণু কেন্দ্রে আপর কোনও বহিরাগত নেই। ইউক্রেন সরকারের হাতে চেরনোবিল তুলে দিয়ে কনভয় এবং বাহিনী নিয়ে রাশিয়া প্রস্থান করেছে বলে তাদের কাছে খবর পৌঁছেছে বলে জানায় IAEA।


পৃথিবীর ভয়ঙ্করতম পারমাণবিক বিপর্যয়ের কেন্দ্রস্থল চেরনোবিল। ১৯৮৬ সালের এপ্রিলে সেখানকার চুল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে সেখান থেকে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে, যা গ্রাস করে ফেলে দেড় লক্ষ বর্গ কিলোমিটারের বেশি অঞ্চলে। হিরোশিমা-নাগাসাকির তুলনায় চেরনোবিল থেকে ৫০০ গুণ বেশি তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায় বলে জানা যায়।  রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ এমনকি চিন এবং আমেরিকাতেও তার প্রভাব টের পাওয়া গিয়েছিল।


ওই দুর্ঘটনার প্রভাবে উত্তর ইউরোপের বায়ুমণ্ডলে তেজষ্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। সুইডেনের পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, নিজেদের দেশেই কিছু ঘটেছে বলে প্রথমে ধারণা জন্মায় তাদের।  তাই তড়িঘড়ি সুইডেনের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে জানা যায় চেরনোবিলে বিপর্যয় ঘটেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসেব অনুয়ায়ী, চেরনোবিল বিপর্যয়ের পর তেজস্ক্রিয় বিকিরণের (Radiation Levels) প্রভাবে প্রায় ৪ হাজার মানুষ মারা যান।


তবে আজও চেরনোবিলের ধ্বংসস্তূপ পুরোপুরি পরিষ্কার করা যায়নি। এখনও সেখানে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ রয়েছে বলে দাবি বিজ্ঞানীদের। সব কিছু পরিষ্কার করে ২০৬৫ সালের আগে সম্পূর্ণ ভাবে সেটিকে নিরাপদ ঘোষণা করা সম্ভব নয় বলে দাবি তাঁদের।