নয়াদিল্লি: পৃথিবীতে থেকেও জনজীবন থেকে দূরে। ‘সভ্য’ সমাজের সঙ্গে নেই কোনও যোগাযোগ। গহীন আমাজ়নকে ঘিরেই আবর্তিত তাঁদের জীবন। পৃথিবীতে সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন, ‘মাশকো পিরো’ জনজাতির মানুষদের এবার ক্যামেরায় ধরা গেল। ‘মাশকো পিরো’ জনজাতিদের এত কাছ থেকে আগে কখনও দেখা যায়নি। তাই উচ্চমানের ভিডিও-টি সামনে আসার পরই শোরগোল পড়ে গিয়েছে। (Viral Video)

Continues below advertisement

আমেরিকার প্রখ্যাত সংরক্ষণবাদী, পল রোজ়েলি ‘মাশকো পিরো’ জনজাতি, শিকারি মানুষদের ওই ভিডিও সামনে এনেছেন। ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, সন্তর্পণে নদীর তীরেে নেমে আসছেন ওই জনজাতি মানুষেরা। হাতে তির-ধনুক রয়েছে তাঁদের। বাইরে থেকে আসা মানুষজনকে দেখে যেমন উৎকণ্ঠিত, তেমন কৌতূহলীও। তির-ধনুক উঁচিয়ে আঘাত হানতেও প্রস্তুত ছিলেন কয়েক জন। (Amazon Tribe Warriors Video)

তবে সবচেয়ে বেশি করে যে বিষয়টি নজর কাড়ে তা হল, গোড়ায় যে আগ্রাসনের ছাপ ছিল চোখেমুখে, কিছু ক্ষণের মধ্যেই তা মিলিয়ে যায়। তির-ধনুক নামিয়ে রেখে বাইরে থেকে আসা অজ্ঞাত পরিচয় মানুষদের দিকে এগিয়ে যান তাঁরা। সেই সময় তাঁদের দিকে একটি নৌকা ঠেলে দেওয়া হয়, যাতে বেশ কিছু কলা রাখা ছিল। খাবার দেখে কারও কারও মুখে হাসিও ফুটে ওঠে। এক বছরেরও বেশি সময় আগে ওই দৃশ্য ক্যামেরায় বন্দি করেন রোজ়েলি। (Amazon Mashco Piro Tribe Video)

Continues below advertisement

ব্রাজ়িল সীমান্তের কাছে, পেরুর দক্ষিণ-পূর্বে, আমাজ়নের গহীন অরণ্যেই ‘মাশকো পিরো’ জনজাতির ওই মানুষদের দেখা মিলেছে বলে খবর। তবে ঠিক কোথায় রয়েছেন তাঁরা, তা খোলসা করেননি রোজ়েলি। তাঁর সাফ যুক্তি, বহির্বিশ্ব থেকে সকলে গিয়ে সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ুক, কোনও বিপদ নেমে আসুক, তা চান না তিনি। লেক্সি ফ্রিডম্যানের পডকাস্টে ফুটেজটি নিয়ে মুখ খুলেছেন রেজ়েলি। জনজীবনে যে সব রোগ-জীবাণু রয়েছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতাও গড়ে ওঠেনি ‘মাশকো পিরো’ জনজাতির মানুষের শরীরে। তাই বহির্বিশ্ব থেকে কেউ গেলে, বড় বিপদ ঘটতে পারে বলেও মত তাঁর। তাঁর আগে কেউ এত কাছ থেকে, কেউ কখনও ‘মাশকো পিরো’ জনজাতিকে ক্যামেরায় বন্দি করতে পারেনি, ওই জনজাতি মানুষদের গলার আওয়াজ শোনাতে পারেনি বলেও দাবি রোজ়েলির। 

আমাজ়ন বৃষ্টি অরণ্যকে রক্ষা করতে রোজ়েলি দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে চলেছেন। ২০০৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে পেরুর ‘মাদ্রে ডি দিওস’ পৌঁছন তিনি। সেই থেকে আমাজ়ন বৃষ্টি অরণ্য, সেখানকার বণ্যপ্রাণ রক্ষায় কাজ করে চলেছেন। ভারত ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজ়িলের মতো দেশের বণ্যপ্রাণ রক্ষার পক্ষেও সওয়াল করে আসছেন তিনি। রোজ়েলি জানিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে বেশ কয়েক জন গবেষকও ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজনের থেকে শার্ট, প্যান্টও চেয়ে নেন ‘মাশকো পিরো’ জনজাতিরা। 

জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন, বর্তমানে পৃথিবীতে এমন ১৯৬টি জনজাতি গোষ্ঠী রয়েছে, যাঁদের সঙ্গে কোনও ভাবেই যোগাযোগ স্থাপন করা যায়নি। তাঁদের নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি এবং অঞ্চল রয়েছে। এই ‘মাশকো পিরো’ জনজাতিও সেই তালিকাতেই পড়ে। বর্তমানে তাঁদের জনসংখ্যা প্রায় ৭৫০। তবে জনজাতি অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলি বেশ উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ওই সব জনজাতি মানুষদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করছেন ইনফ্লুয়েন্সাররা। ফলে ওই সব মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। Survival International নামের একটি সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে, সমাজের বাইরে থাকা ওই সব মানুষদের কাছাকাছি যাওয়া, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন বেশ কয়েক জন ইনফ্লুয়েন্সার। রোমাঞ্চের নামে জনজাতি মানুষগুলির অস্তিত্বকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি ওই সংস্থার। 

এ প্রসঙ্গে ভারতের নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপেরও উল্লেখ করে Survival International. তারা জানায়, সেখানে বসবাসকারী জনজাতি মানুষদের লাগাতার বিরক্ত করা হচ্ছে। ইনফ্লুয়েন্সার থেকে বেআইনি কারবারিরা যখন তখন তাঁদের অঞ্চলে হাজির হচ্ছেন এবং যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছেন। ২০২৫ সালের গোড়াতেই আমেরিকার ইনফ্লুয়েন্সার মিখাইলো ভিক্টরোভিচ পলিয়াকভ নর্থ সেন্টিনেল আইল্যান্ডে পৌঁছন এবং সেখানকার জনজাতি মানুষদের তিনি ডায়েট কোক এবং নারকেল খেতে দেন। ভারত সরকারের অধিকারিকরা মিখাইলোকে গ্রেফতার করেন। পরে যদিও জামিনে মুক্তি পেয়ে যান মিখাইলো।

রোজ়েলি যে ‘মাশকো পিরো’ জনজাতির মানুষজনকে ক্যামেরায় বন্দি করেছেন, ‘সভ্য’ জীবনের ভয়াবহতা আগেই প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁরা। ১৮৯৪ সালে পেরুর ধনকুবের ব্যবসায়ী কার্লোস ফিৎজক্যারাল্ডের প্রাইভেট আর্মি নদী অববাহিকা এলাকায় ‘মাশকো পিরো’ জনজাতিকে আক্রমণ করে, তাঁদের কচুকাটা করা হয়। ‘মাশকো পিরো’ জনজাতির অনেককে ক্রীতদাস বানিয়েও রাখা হয়েছিল।  যাঁরা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁরা ক্রমশন জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে যেতে শুরু করেন। ক্রমশ বহির্বিশ্ব থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে যান তাঁরা। তবে ২১ শতকে ঘন ঘন তাঁদের দেখা মিলতে শুরু করে। তবে এর জন্যও কাঠের চোরাকারবারিদের দায়ী করছেন সংরক্ষণবাদীরা। তাঁদের মতে, বেআইনি ভাবে গাছ কেটে আমাজ়নকে সাফ করে দেওয়া হচ্ছে। আবার তৈল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের কাজও চলছে ওই অঞ্চলে, যার দরুণ বিমানের আনাগোনা বেড়েছে জঙ্গলের উপর দিয়ে।