নয়াদিল্লি: বর্ষবরণের আগেই ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল জাপান। রিখটার স্কেলে কম্পনের তীব্রতা ছিল ৬। এখনও পর্যন্ত হতাহতের কোনও খবর মেলেনি। তবে এই নিয়ে পর পর বেশ কয়েক বার তীব্র ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল জাপান। বুধবারও বহু দূরের অঞ্চলে কম্পন অনুভূত হয়েছে বলে খবর। তবে সুনামি সতর্কতা জারি হয়নি এখনও পর্যন্ত। (Earthquake in Japan)

Continues below advertisement

ভারত এখনও বর্ষবরণের অপেক্ষা করলেও, জাপান ইতিমধ্যেই নতুন বছরে পদার্পণ করেছে। তবে বর্ষবরণের ঠিক আগে, বুধবার বিকেলে ভূমিকম্প হয় সেখানে। পূর্বের নোডা অঞ্চলের মাটি কেঁপে ওঠে তীব্র কম্পনে। নোডার ৯০ কিলোমিটার দূরত্বে, ইওয়াতের হনশুতে, সমুদ্রের ৪০ কিলোমিটার গভীরতা থেকে কম্পন ছড়িয়ে পড়ে বলে জানা গিয়েছে। (Japan Earthquake News)

পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্প প্রবণ দেশ জাপান। প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর সেখানে কম্পন অনুভূত হয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় 'রিং অফ ফায়ার' অঞ্চলের মধ্যে পড়ে জাপান। সেখানে মাটির নীচে টেকটোনিক পাতগুলি সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। পৃথিবীতে ৬ বা তার বেশি তীব্রতায় যত ভূমিকম্প হয়, তার ২০ শতাংশই হয় সেদেশে।

Continues below advertisement

এদিন যেখানে ভূমিকম্প হয়েছে, কয়েকদিন আগেই ৪.৮ তীব্রতায় সেখানে মাটি কেঁপে ওঠে। তার আগে, গত ৮ ডিসেম্বর ৭.৬ তীব্রতায় ভূমিকম্প হয় আওমোরি অঞ্চলে, যা জাপানের হনশুর উত্তরে অবস্থিত। সেবার ৫২ জন আহত হন। পর পর বেশ কয়েকটি আফটারশকও অনুভূত হয়। 

মাটির নীচে টেকটোনিক পাতগুলির গতিবিধির উপর লাগাতার নজরদারি চালাচ্ছে জাপান। জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি সেরে রেখেছে তারা। দেশের নাগরিকদের সকলকে সরকারি নির্দেশিকা মেনে চলতে বলা হয়েছে। খোলা রাখতে বলা হয়েছে চোখ-কান। সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চলগুলিতে পরিকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি কেমন হতে পারে, তা নিয়ে চলছে সমীক্ষাও। নিকট ভবিষ্যতে জাপানে বড় ভূমিকম্প হতে পারে বলে আগেই সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাই সাবধানী পদক্ষেপ করছে সেদেশের সরকার।

জাপানের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন,  দেশের উত্তরের হোক্কাইদো দ্বীপটিই বিপর্যয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।  ৭ থেকে ৯ বা তারও বেশি তীব্রতায় ভূমিকম্প আছড়ে পড়তে পারে দ্বীপটিতে। সেই সঙ্গে উঁচু তাণ্ডব চালাতে পারে সুনামি, যাতে জাপান সাগরের উপকূল এলাকার অন্তর্গত ৩৩টি পুরসভার প্রায় ৭৫০০ বাসিন্দা মারা যেতে পারেন। প্রাণহানি যাতে এড়ানো যায়, আগে থেকেই যাতে প্রস্তুত থাকা যায়, এখন থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে বলে সরকারকে সতর্ক করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, জাপান উপকূলের ঠিক উল্টো দিকে যে চিশিমা পরিখা রয়েছে, তার নীচে মাটির গঠন অত্যন্ত বিপজ্জনক। সেখানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় টেকটোনিক পাতটি ঢুকে রয়েছে নর্থ আমেরিকান পাতের নীচে। ফলে একটি ২২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যুতিরেখার সৃষ্টি হয়েছে, যা একটু এদিক ওদিক হলেই ভূমিকম্পের তীব্রতা রিখটার স্কেলে ৯ ছুঁয়ে ফেলতে পারে। সুনামি আছড়ে পড়লে ঢেউয়ের উচ্চতা হতে পারে ২০ মিটার পর্যন্ত।

আবার হোক্কাইদোর পূর্বে কুরিল-কামচাটকা পরিখাও রয়েছে। আজ থেকে ৪০০ বছর আগে তীব্র ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ওই অঞ্চল। তাতে জলভাগের দিক থেকে একটি পাত স্থলভাগের দিকে প্রায় ২৫ মিটার সরে আসে। সেই থেকে যদি বছরে ৮ সেন্টিমিটার করেও ওই পাতটি সরে আসতে থাকে স্থলভাগের দিকে, তাতেও তীব্র ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মত বিজ্ঞানীদের। 

তোহকু ইউনিভার্সিটি, হোক্কাইদো ইউনিভার্সিটি এবং জাপানের মেরিন-আর্থ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকরা ২০১৯ সালেই সমুদ্রগর্ভে GPS অবজার্ভেশন পয়েন্ট বসাতে সফল হন, যার মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশের পরিস্থিতির উপর নজরদারি চলছে। এর আগে, ২০২২ সালে হোক্কাইদো সরকার জানায়, প্রশান্ত মহাসাগরের দিকটিতে যদি ভূমিকম্প হয় এবং তা থেকে সুনামি আছড়ে পড়ে, তার দরুণ কমপক্ষে ১ লক্ষ ৪৯ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে। যে কারণে চ্যুতিরেখা বিপর্যয় নিরসন টিমও গঠন করা হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে তারা সক্রিয় রয়েছে। 

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জাপান উপকূলে সাগরের নীচে কমপক্ষে ১৫টি বিপজ্জনক চ্যুতিরেখা রয়েছে। দিনের বেলা বিপর্যয় ঘটলে কী হতে পারে, রাতে হলে কী হতে পারে, গ্রীষ্মকালে ঘটলে কী হবে, শীতকালে কী পরিণতি হতে পারে— এমন ৯০ প্রকারের পরিকল্পনাও ছকে রাখা হয়েছে। শীতের রাতে তুষারপাতের মধ্যে বিপর্যয় ঘটলে ১৬০০০ বাড়ি ভেঙে পড়েতে পারে বলেও অনুমান করে রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন। হোক্কাইদোর উত্তরের ওয়াক্কানাই, হিরুতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা। 

তোহকু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ফুমিয়াকি তোমিতার বক্তব্য “অল্প সময়ের মধ্য়ে পর পর ৫ ও ৬ তীব্রতায় বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প হয়ে গিয়েছে। আতঙ্কিত না হয়ে পরিকল্পনামাফিক এগোতে হবে, মাটির নীচে কী ঘটছে, নজরদারি চালিয়ে যেতে হবে।” যে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে, যে তীব্র ভূমিকম্পের কথা শোনা যাচ্ছে, তাকে সাধারণ ভূমিকম্পের থেকে আলাদা করতে ‘মেগাকোয়েক’ বলছেন অনেকে। কিন্তু ফুমিয়াকির মতে, ঝুঁকি থাকতেই পারে। তা নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে, সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।  সুনামির ক্ষেত্রে উদ্ধারকার্যের সঠিক পরিকল্পনা থাকা দরকার। ২০১১ সালের মার্চ মাসে তোহকু বিপর্যয়ের সময় ২২০টি বাড়ি খালি করে দেওয়া হয়েছিল, শহরের মানুষজনকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই সময় সুনামির উচ্চতা ছিল ৩ মিটার। কিন্তু তাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি আটকানো যায়নি।