নয়াদিল্লি: পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে উপনিবেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর বিজ্ঞানীরা। আর সেই আবহেই বড় ঘটনা ঘটে গেল আমেরিকায়। আকাশে ওড়ার আগেই বিস্ফোরণে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় New Glenn রকেট। বিস্ফোরণের পলে সৃষ্ট ধোঁয়ার ছত্রাক চোখে পড়েছিল বহু দূর থেকেও। এবার জানা গেল শুধু আগুন এবং ধোঁয়াই নয়। ওই বিস্ফোরণের ফলে তীব্র শব্দতরঙ্গের সৃষ্টি হয়, যা বিস্ফোরণস্থল ফ্লোরিডা থেকে ১৬০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত টেক্সাস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। চেরনোবিল পরমাণু কেন্দ্রে ঘটা বিস্ফোরণের সঙ্গে এর তুলনা করছেন বিজ্ঞানীরা। (Blue Origin Rocket Explosion)
ই-কমার্স সংস্থা অ্যামাজ়নের কর্ণধার, ধনকুবের জেফ বেজোসের সংস্থা Blue Origin মহাকাশ গবেষণার জগতে পা রেখেছে। তাদের তৈরি বাণিজ্যিক রকেটগুলির মধ্যে Blue Glen বৃহত্তম এবং সবচেয়ে শক্তিশালীও। আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA-র মহাকাশযান উৎক্ষেপণ প্রযুক্তির সমানই দৈর্ঘ্য, ৩২০ ফুট। বৃহদাকার মহাকাশযান উৎক্ষেপণের উপযোগী সেটি। ২০২৫ সালের জানুয়ারি, ২০২৫ সালেরই নভেম্বরে NASA-র মহাকাশযানকে মঙ্গলগ্রহের উদ্দেশে মহাশূন্যে উৎক্ষেপণ করে সেটি। মহাকাশে স্যাটেলাইট পৌঁছে দেওয়ার পর এবছর দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় তাদের পুনর্ব্যবহারযোগ্য বুস্টার নিরাপদে ফিরেও আসে পৃথিবীতে। (New Glenn Rocket Blast)
তবে গত ২৯ মে চতুর্থ অভিযানের সময় কোনও রকম সতর্কবার্তা ছাড়াই New Glenn-এর বুস্টারটিতে তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে। ফ্লোরিডার Cape Canaveral Force Station থেকে উৎক্ষেপণের সময় হঠাৎই তীব্র শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং একেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় বুস্টারটি। আকাশে বহু উঁচু পর্যন্ত উড়ে যায় ধ্বংসাবশেষ। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের গোলা এবং ছত্রাকের মতো দেখতে ধোঁয়ার মেঘ চোখে পড়ে বহু দূর থেকেও। ৫ অগাস্ট Blue Origin জানায়, অক্সিজেন ভালভে ত্রুটি থাকাতেই ওই বিস্ফোরণ ঘটে। বিজ্ঞানীদের মতে, মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে উৎক্ষেপণের সময় অত বড় বিস্ফোরণ আগে কখনও ঘটেনি। লঞ্চপ্যাডটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সারাতে একবছর সময় লাগবে কমপক্ষে। চাঁদে ঘাঁটি গড়তে NASA-র যে অভিযান, তা New Glenn-এর লঞ্চপ্যাড থেকেই হওয়ার কথা। বিস্ফোরণের জেরে সেটিও পিছিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা।
ওই বিস্ফোরণে হতাহতের কোনও ঘটনা ঘটেনি। তবে তীব্র শব্দে কান ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের। বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট অভিঘাত তরঙ্গ ধাক্কা মারে তাঁদের কানে। অন্তত ২১৭ কিলোমিটার দূরেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। বরং এ ছিল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ১২ অগাস্ট The Seismic Record জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্র আরও ভয়ঙ্কর তথ্য সামনে এনেছে। আমেরিকার বিভিন্ন স্টেশন থেকে প্রাপ্ত ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখেন গবেষকরা, যার সঙ্গে বিস্ফোরণের সময় মানুষের শ্রবণ সীমার নীচে থাকা কম ফ্রিকোয়েন্সির শব্দের সঙ্গে মিলে গিয়েছে। কমপক্ষে ৩৬টি স্টেশনে ওই শব্দতরঙ্গ ধরা পড়ে, যার মধ্যে সবচেয়ে দূরবর্তী স্টেশনটি ছিল উত্তর-পূর্ব টেক্সাসে, ফ্লোরিডার বিস্ফোরণস্থল থেকে ১৬৮৪ কিলোমিটার দূরে। অর্থাৎ মানুষের কানে না পৌঁছলেও যন্ত্র ওই শব্দতরঙ্গ ধরতে সফল হয়।
আর তাতেই বিস্ফোরণের তীব্রতা সম্পর্কে আঁচ পাওয়া গিয়েছে। শব্দতরঙ্গের কম্পাঙ্ক এবং পাড়ি দেওয়া দূরত্ব নিয়ে ২০০৯ সালের একটি গবেষণার উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, The Glenn-এর রকেট বিস্ফোরণটি ১৪৪ টন TNT (আমেরিকার হিসেবে) শক্তিশালী ছিল, যা ১৯৮৬ সালে চেরনোবিল পরমাণু কেন্দ্রে ঘটা বিস্ফোরণের চেয়েও সামান্য বেশি। বিস্ফোরণের সময় কত জ্বালানি পুড়েছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মত হল যে, আগুনের গোলার আকারের নিরিখে পরিমাণ কম বলেই ঠাহর হয়।
