নয়াদিল্লি: নেহাত ভুল, না ইচ্ছাকৃত ভুল, তা নিয়ে বিতর্ক বরাবরের। পৃথিবীর মানচিত্র সংশোধনের দাবি একেবারেই নতুন কিছু নয়। এতদিনে সেই নিয়ে ভোটাভুটি হল রাষ্ট্রপুঞ্জে, যাতে ভূখণ্ডের আয়তনের নিরিখে পৃথিবীর মানচিত্র সংশোধনের পক্ষে ভোট দিয়েছে ভারত-সহ একাধিক দেশ। তবে আফ্রিকাকে বড় করে দেখানোর বিরোধিতা করে ভোট দিয়েছে আমেরিকা। প্রস্তাব অনুযায়ী পৃথিবীর নতুন মানচিত্র আঁকা হলে, তাতে আফ্রিকাকে অনেক বড় দেখাবে। ছোট দেখাবে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপকে। (World Map Distortion)
শুক্রবার রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় পৃথিবীর মানচিত্র সংশোধনের প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয় ১৯৩টি সদস্য দেশের কাছে। ভোটাভুটির লক্ষ্য ছিল, বৈশ্বিক মানচিত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে ভূখণ্ডের আয়তনের নিরিখে আফ্রিকার সঠিক প্রতিনিধিত্ব তুলে ধরা। (World Map Revision)
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ টোগোর তরফে প্রস্তাবটি জমা পড়েছিল, যাতে বলা হয়, ষোড়শ শতকে জলপথে পরিবহণের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রেখে পৃথিবীর যে মানচিত্র তৈরি হয়, তা আজও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শিক্ষা, গণমাধ্যম, সরকারি কাজকর্ম এমনকি ডিজিটাল দুনিয়াতেও ওই মানচিত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ওই মানচিত্রে বেশ কিছু ত্রুটি রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, নিরক্ষরেখা থেকে দূরে অবস্থিত উত্তর এবং দক্ষিণ গোলার্ধের ভূখণ্ডগুলির আকারের বিকৃতি। (New World Map)
আরও পড়ুন: শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ নিয়ে বড় বার্তা শুভেন্দু অধিকারীর, কমাতে বললেন মৌখিক পরীক্ষার নম্বর
পৃথিবীর মানচিত্র সংশোধনের ওই প্রস্তাবে আরও বলা ছিল যে, মানচিত্রের ওই বিকৃতি এবং বিকৃত মানচিত্র ব্যবহার করে যাওয়ার প্রবণতা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। কারণ ওই মানচিত্রে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়াকে প্রকৃত আয়তনকে ছোট করে দেখানো হয়েছে। ভারসাম্যহীনতার যে ধারণা তৈরি হয়েছে ওই মানচিত্রকে ঘিরে, তা বজায় রয়েছে আজও। ভারতের তরফে রঘু পুরী জানান, নির্ভুল এবং সঠিক প্রতিনিধিত্বের যে উদ্দেশ্য, তার জন্য এই প্রস্তাবকে স্বাগত। তিনি বলেন, “ভূগোল এবং বিশ্বের আয়তন বোঝার ক্ষেত্রে মানচিত্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।” তবে এর নেপথ্যে অন্য কোনও উদ্দেশ্যকে যে ভারত সমর্থন করে না, তাও পরিষ্কার জানিয়ে দেন তিনি। ফ্রান্সের বিদেশমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বরোত বলেন, “মানচিত্র বদলালেই পৃথিবী বদলে যাবে না। কিন্তু পৃথিবীকে বিকৃত ভাবে তুলে ধরা কিছুতে সংশোধন ঘটানো সত্যনিষ্ঠ থাকার পরিচয়।”
পৃথিবীর মানচিত্র সংশোধনের প্রস্তাবে সমর্থন জানায় ১৬৪টি দেশ। ভোটদান থেকে নিজেদের বিরত রাখে এস্টোনিয়া, জর্জিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলদোভা, সার্বিয়া, ইউক্রেনের মতো দেশ। বিশ্ব মানচিত্র সংশোধনের বিরুদ্ধে যে একটিমাত্র ভোট পড়ে, তা আমেরিকার।
আরও পড়ুন: ২৭ নভেম্বর বাল্যবিবাহ নির্মূলকরণ দিবস, সর্বসম্মতিতে সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপুঞ্জে
পৃথিবীর মানচিত্র নিয়ে বিতর্ক আজকের নয়। কারণ বর্তমানে পৃথিবীর যে মানচিত্র রয়েছে, তাতে উত্তর আমেরিকা এবং গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার সমান সমান দেখানো হয়েছে। ছোট করে দেখানো হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকাকেও। মানচিত্রে আলাস্কাকে ব্রাজিলের সমান আকারে দেখানো হয়েছে। বাস্তবে আলাস্কার আয়তন ১৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার, ব্রাজিলের ৮৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। আন্টার্কটিকাকে বড় করে দেখানো হয়েছে মানচিত্রে। সেই তুলনায় অনেক ছোট করে দেখানো হয়েছে পৃথিবীর মধ্যভাগকে। বাস্তবে আফ্রিকার চেয়ে অনেক ছোট গ্রিনল্যান্ড। সকলের আসল প্রতিনিধিত্ব তুলে ধরা বলে দেখা যাবে, গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে আকারে ১৪ গুণ বড় আফ্রিকা। মানচিত্র সংশোধনের প্রস্তাবটিতে আগের মানচিত্র তুলে দেওয়ার দাবি যদিও করা হয়নি।
২০১৮ সালে যে Equal Earth Projection প্রকাশিত হয়, তাতে ভূখণ্ডের আয়তনের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ মানচিত্র তুলে ধরা হয়, যাতে ব্রাজিলের থেকে ছোট দেখায় ইউরোপকে। আফ্রিকাকে অনেক বড় দেখানো হয়। তুলনায় ক্ষুদ্র আকার ফুটে ওঠে গ্রিনল্যান্ডের।
