কলকাতা: মহাকাশ থেকে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে নাসার একটি বিশাল টেলিস্কোপ! ওজন প্রায় দেড় টন। প্রায় ২২ বছর ধরে মহাকাশে ঘুরে মহাবিশ্বের নানা রহস্যের সন্ধান দিয়েছে এই যন্ত্র। এবার তারই পৃথিবীতে ফিরে আসার পালা। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে নয়, কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে চলেছে নাসার 'Neil Gehrels Swift Observatory'। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় টেলিস্কোপটির বেশিরভাগ অংশ পুড়ে গেলেও কিছু ভারী যন্ত্রাংশ পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়তে পারে। সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষের বিস্তৃত এলাকার মধ্যে রয়েছে ভারতও। মুম্বই, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ের মতো শহর রয়েছে সম্ভাব্য ঝুঁকির অক্ষাংশের মধ্যে। কিন্তু কলকাতা কি বিপদমুক্ত? কবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে এই মহাকাশযান? কতটা বিপজ্জনক হতে পারে এই ঘটনা? জেনে নিন বিস্তারিত।
কবে পৃথিবীতে আছড়ে পড়তে পারে নাসার টেলিস্কোপ?
নাসার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৪ নভেম্বর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে Neil Gehrels Swift Observatory। ভারতীয় সময় অনুযায়ী, সম্ভাব্য সময় দুপুর ২টো নাগাদ। তবে এই সময়ের ক্ষেত্রে প্রায় ১১ ঘণ্টার অনিশ্চয়তা রয়েছে। অর্থাৎ, ঠিক কখন এবং পৃথিবীর কোথায় টেলিস্কোপটির ধ্বংসাবশেষ এসে পড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
প্রায় ১,৫০০ কিলোগ্রাম ওজনের এই মহাকাশ টেলিস্কোপটি ২০০৪ সালের ২০ নভেম্বর মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে মাত্র দু'বছরের অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সময় ধরে কাজ করেছে Swift। প্রায় ২২ বছর ধরে মহাবিশ্বের নানা বিস্ফোরণ, সুপারনোভা এবং মহাজাগতিক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছে এই টেলিস্কোপ।
ভারতের কোন কোন শহরে পড়তে পারে ধ্বংসাবশেষ?
নাসার হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সম্ভাব্য বলয়টি বিষুবরেখার উত্তর অক্ষাংশ ২০.৬ ডিগ্রি থেকে দক্ষিণ অক্ষাংশ ২০.৬ ডিগ্রির মধ্যে বিস্তৃত। অর্থাৎ পৃথিবীর মাঝের একটি বিশাল অংশ এই সম্ভাব্য অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। ভারতের ক্ষেত্রে এই বলয়ের মধ্যে রয়েছে মুম্বই, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ের মতো শহর। পশ্চিম উপকূলের দমন থেকে পূর্ব উপকূলের ওড়িশার কটক পর্যন্ত একটি কাল্পনিক রেখার দক্ষিণের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই বলয়ের মধ্যে পড়ছে। তবে কলকাতা, দিল্লি এবং উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অংশ এই অক্ষাংশের বলয়ের বাইরে রয়েছে। ফলে কলকাতার উপর সরাসরি ধ্বংসাবশেষ পড়ার সম্ভাব্য অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
আকাশেই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে অধিকাংশ অংশ?
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় প্রচণ্ড ঘর্ষণ ও উত্তাপের কারণে টেলিস্কোপটির অধিকাংশ অংশই পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা। তবে কিছু ভারী যন্ত্রাংশ পুরোপুরি নষ্ট না-ও হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, টেলিস্কোপের কিছু টাংস্টেন দিয়ে তৈরি অংশ এবং আয়নার কয়েকটি টুকরো বায়ুমণ্ডলের প্রচণ্ড উত্তাপ সহ্য করে পৃথিবীর পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। টাংস্টেন অত্যন্ত ঘন এবং উচ্চ গলনাঙ্কের ধাতু হওয়ায় এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় দেড় টন ওজনের টেলিস্কোপটির ১০০ কিলোগ্রামেরও কম অংশ শেষ পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছতে পারে। এমনকী, বেঁচে যাওয়া অংশগুলির অধিকাংশই সমুদ্রে পড়ার সম্ভাবনা বেশি।
কেন নিয়ন্ত্রণ হারাল নাসার এই মহাকাশ টেলিস্কোপ?
মহাকাশে থাকা কোনও উপগ্রহ বা টেলিস্কোপ চিরকাল একই কক্ষপথে থাকতে পারে না। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে থাকা বস্তুর উপরেও বায়ুমণ্ডলের অতি পাতলা স্তরের প্রভাব পড়ে। এর ফলে ধীরে ধীরে গতি কমে এবং কক্ষপথ নিচের দিকে নামতে থাকে। Swift-এর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। গত কয়েক বছরের সৌরঝড় ও সূর্যের অতিরিক্ত সক্রিয়তার কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তর প্রসারিত হয়েছে। ফলে মহাকাশযানটির উপর বায়ুমণ্ডলীয় বাধা বা Atmospheric Drag বেড়েছে। দ্রুত কমেছে তার কক্ষপথের উচ্চতা। টেলিস্কোপটিকে বাঁচানোর জন্য নাসা একটি বিশেষ উদ্ধার অভিযানও চালিয়েছিল। Katalyst Space নামে একটি সংস্থার তৈরি Link নামের রোবোটিক মহাকাশযানকে পাঠানো হয়েছিল Swift-এর কক্ষপথ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেই অভিযান সফল হয়নি। মহাকাশযানটির দিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থায় সমস্যা হওয়ায় Swift-কে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা কতটা?
এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের জন্য বড়সড় বিপদের আশঙ্কা অত্যন্ত কম বলেই মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশই জলভাগ। ফলে কোনও ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীতে পৌঁছলেও সমুদ্রে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। নাসার মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই ঘটনার কারণে পৃথিবীর কোনও মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত কম। CBS/AP-র প্রতিবেদনে সেই ঝুঁকি আনুমানিক ২,১০০-এর মধ্যে ১ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের নিজস্ব মহাকাশ নজরদারি ব্যবস্থাও রয়েছে। শ্রীহরিকোটায় অবস্থিত ISRO-র Multi-Object Tracking Radar বা MOTR পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের আগে মহাকাশের বিভিন্ন বস্তু ও উপগ্রহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। তবে Swift-কে এই মুহূর্তে ইসরো আলাদাভাবে ট্র্যাক করছে কি না, সে বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
২২ বছরে কী কী আবিষ্কার করেছে Swift?
এই মহাকাশ টেলিস্কোপের অবদানও কম নয়। ২০০৪ সালে মাত্র দু'বছরের অভিযানের জন্য পাঠানো হলেও ২২ বছর ধরে মহাবিশ্বের নানা রহস্যের সন্ধান দিয়েছে এটি। ২,০০০-এরও বেশি Gamma-Ray Burst বা গামা রশ্মির বিস্ফোরণ পর্যবেক্ষণ করেছে। প্রায় ১,৪০০টি সুপারনোভা বা নক্ষত্রের বিস্ফোরণ শনাক্ত করেছে। ধূমকেতু, গ্রহাণু এবং ব্ল্যাক হোল সংক্রান্ত বিভিন্ন মহাজাগতিক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছে। মহাবিশ্বের অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরণের সংকেত দ্রুত শনাক্ত করে হাবল ও জেমস ওয়েবের মতো টেলিস্কোপকে পরবর্তী পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দিয়েছে। অর্থাৎ, মহাকাশ গবেষণায় দীর্ঘ ২২ বছরের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হতে চলেছে। এবার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের অপেক্ষায় Swift। বিজ্ঞানীদের নজর এখন তার শেষ যাত্রার দিকে।
