নয়াদিল্লি: জন্মের সময় লিঙ্গের অনুপাতেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে। ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ডের গবেষণায় এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য় উঠে এল। বলা হয়েছে, তাপমাত্রা যত বেশি হবে, জন্মের সময় লিঙ্গের অনুপাতেও ততই প্রভাব পড়বে। ভারত এবং সাহারা-আফ্রিকার অন্তর্গত ৩৩টি দেশে ৫০ লক্ষ শিশুর জন্ম বিশ্লেষণ করে এই তথ্য সামনে এনেছে ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড। (Sex Ratio at Birth)
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দুই অঞ্চলেই তাপমাত্রা লাগাতার ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে ছিল, যার দরুণ বেশি সংখ্যক কন্যাসন্তান জন্মেছে সেখানে। গবেষণাটিতে নেতৃত্ব দেন আবদেল গনি। তিনি জানান, “অত্যধিক তাপমাত্রা সাধারণ কোনও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ঝুঁকি নয়। তাপমাত্রা কী ভাবে মনুষ্যজাতির প্রজননকে আকার দেয়, কে জন্মাবে, কে জন্মাবে না, তার উপরও প্রভাব ফেলে।” গবেষকরা জানিয়েছেন, ভ্রূণ কতটা যুঝতে পারবে, তার উপর তাপমাত্রার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। (Climate Change)
জনসংখ্যায় পুরুষ এবং মহিলাদের অনুপাতই লিঙ্গের অনুপাত। বৈশ্বিক জনসংখ্যার হিসেব বলছে, জনসংখ্যার নিরিখে পুরুষরা সামান্য এগিয়েই রয়েছেন এখনও। প্রতি ১০০ নারী পিছু পুরুষের সংখ্যা ১০১ থেকে ১০২। জন্মের সময় লিঙ্গের অনুপাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বুঝতে গিয়ে কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষকরা জানিয়েছেন, লিঙ্গের অনুপাত মা এবং বাবার স্বাস্থ্যকেও নির্দেশিত করে, ভ্রুণের যুঝতে পারার ক্ষমতা এবং কিছু ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্যের দিকেও ইঙ্গিত করে। যে ৫০ লক্ষ জন্ম নিয়ে গবেষণা হয়েছে, ওই সব অঞ্চলের তাপমাত্রা ছিল ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি। সেখানে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের জন্মের হার বেশি ছিল।
সাহারা-আফ্রিকার অন্তর্গত দেশগুলিতে জন্মের আগে ভ্রূণের মৃত্যু ঘটেছে বহু ক্ষেত্রে, যার জন্য দায়ী মূলত অত্যধিক তাপমাত্রা। উচ্চ তাপমাত্রায় মায়ের শরীরে রক্ত সঞ্চালনে তারতম্য ঘটে, ভ্রূণের কাছে অক্সিজেন, পুষ্টি পৌঁছয় না। বিশেষ করে প্রথম ত্রৈমাসিকে ঝুঁকি বেশি থাকে। যাঁরা বাইরে কাজে বেরোন, তাঁদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বেশি।
ভারতের ক্ষেত্রে বেশি বয়সের গর্ভাবস্থায় বিশেষ করে এই প্রভাব চোখে পড়েছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে তাপমাত্রা অত্যধিক হলেও ছেলের জন্মের সম্ভাবনা কমে যায়। বিশেষ করে যে সমস্ত মায়েদের বয়স তুলনামূলক বেশি, গর্ভাবস্থা যেখানে ২০ সপ্তাহ বা তার সামান্য সময় বেশি স্থায়ী হয়। তাই বিশ্ব উষ্ণায়নও লিঙ্গের অনুপাতে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ডের পাশাপাশি, ইউনিভার্সিটি অফ ম্যাঞ্চেস্টারও ঋতুর সঙ্গে পুরুষদের স্বাস্থ্যের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে। ডেনমার্ক এবং ফ্লোরিডা, দুই ভিন্ন পরিবেশের ১৫৫০০ পুরুষের দেহরস পরীক্ষা করে দেখা হয়। তবে তাতে দেখা যায়, গ্রীষ্মকালে দেহরসের গুণমান শীতকালের তুলনায় ভাল থাকে। তাই শুধুমাত্র উচ্চ তাপমাত্রা লিঙ্গের অনুপাত নির্ধারণ করে বলে মনে করছেন না ইউনিভার্সিটি অফ ম্যাঞ্চেস্টারের গবেষকরা।
ছেলে এবং মেয়ের জন্মের হারের মধ্যে ফারাক কী?
প্রকৃতির বৈশিষ্ট অনুযায়ী, এযাবৎ দেখা গিয়েছে, প্রতি ২০০ জন্মের মধ্যে ১০৫টি পুরুষ হওয়াই দস্তুর। এই অনুপাতের কার্যকারণ বহু দশক ধরেই গবেষণা চলে আসছে, নিহিত কারণ বের করার চেষ্টা চালিয়ে আসছেন বিজ্ঞানীরা। এর সপক্ষে একটি তত্ত্ব বার বার উঠে আসে যে, মেয়েদের দীর্ঘায়ু জীবনকালের সঙ্গে ভারসাম্য রাখতেই বেশি সংখ্যক পুরুষের জন্ম। কারণ অধিকাংশ দেশেই মহিলাদের আয়ু পুরুষদের তুলনায় বেশি। ব্রিটেনের ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস বলছে, সদ্যোজাত ছেলে ৭৯.২ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। সদ্যোজাত মেয়ের আয়ু হতে পারে ৮২.৯ বছর। প্রতি একজন শতায়ু পুরুষ পিছু, শতায়ু নারীর সংখ্যা তিন অথবা চার। তবে কেন এই ফারাক, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি আজও। আবার লিঙ্গবৈষম্যও এই ফারাক আরও বৃদ্ধি করেছে। চিনে এক সন্তান নীতি চালু হওয়ার পর সেখানে পুত্রসন্তানধারণের ঝোঁক চোখে পড়ে মা-বাবাদের মধ্যে।
