নয়াদিল্লি: পুনর্জন্মে বিশ্বাস করেন কিছু মানুষ। হাতেগোনা কিছু মানুষ আবার দাবি করেন, আগের জন্মের কথা মনে আছে তাঁদের। কিন্তু মৃত্য়ুর পর পুনরায় জন্মগ্রহণ নিয়ে এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত কোনও তথ্যপ্রমাণ হাতে আসেনি। তবে পূর্বজন্মের কথা মনে থাকা নিয়ে বিশেষ গাণিতিক ‘প্য়াটার্ন’ খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা। (Reincarnation Research)

Continues below advertisement

মৃত্যুর পর আমাদের চেতনার কী হয়, তা নিয়ে যেমন কৌতূহলের শেষ নেই, তেমনই পুনর্জন্মের তত্ত্বও নিয়েও গবেষণা চলে আসছে দীর্ঘ সময় ধরে। পূর্বজন্মের কথা মনে থাকার যে দাবি শোনা যায়, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে যখন এমন দাবি শোনা যায়, তার জন্য পৃথক গবেষণা চলে। এই ধরনের ঘটনাকে Cases of the Reincarnation Type (CORT) বলা হয়। (Reincarnation Mystery)

ছয়ের দশক থেকেই এ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে আসছে ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়ার ডিভিশন অফ পার্সেপচুয়াল স্টাডিজ় বিভাগ। এমন এমন হাজার হাজার মানুষের তথ্য় জমা করে রাখা হয়েছে সেখানে, যাঁরা পূর্বজন্মের স্মৃতি থাকার কথা জানিয়েছেন। সেই তথ্যভাণ্ডার নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে গিয়েই নতুন একটি গাণিতিক ‘প্যাটার্ন’ বা যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। 

Continues below advertisement

আরও পড়ুন: সত্যি সত্যিই ডেমোগর্গন চলে এল পৃথিবীতে? সিসিটিভিতে রহস্যময় প্রাণীর দেখা মিলল, অন্য ডাইমেনশন থেকে এসেছে বলে দাবি

Psychology of Consciousness: Theory, Research, and Practice জার্নালে রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, বিষয়টির সোজাসাপ্টা ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। তবে একটি চমকপ্রদ বিষয় সামনে এসেছে। মোট ১৬৭৮টি ঘটনা বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখে এক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়। তাঁকে Past Person বা গত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন গবেষকরা। দেখা যায়, ওই ব্যক্তির জীবন বৃত্তান্ত এবং একটি শিশুর পূর্বজন্মের স্মৃতি মিলে গিয়েছে। 

ওই শিশুটির মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলেন গবেষকরা। সব তথ্য যাচাই করে দেখা হয়। মিলিয়ে দেখা হয় নির্ভরযোগ্য নথিপত্রের সঙ্গে। গবেষণা করতে গিয়ে Intermission Time বা অন্তর্বর্তী সময়কে চলকরাশি হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ মৃত ব্যক্তি এবং শিশুটির জন্মের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধানের উপর জোর দেওয়া হয় বিশেষ ভাবে। এর পর ১৩১৯টি এমন ঘটনা সামনে আসে, যেখানে অন্তর্বর্তী সময়কাল ছিল ১৬ মাস। 

বিস্ময়কর ভাবে ওই তথ্যভাণ্ডার থেকে এমন একটি ঘটনাও উঠে আসে, যেখানে অন্তর্বর্তী সময়কাল ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ, ১৫০ বছর। অর্থাৎ অর্থাৎ পূর্বজন্মের স্মৃতি বলে একজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মিলে যায় ১৫০ বছর আগে প্রয়াত এক ব্যক্তির জীবনের সঙ্গে। তবে অদ্ভুত বিষয় হল, আকস্মিক মৃত্যুতে এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের ব্যবধান রহস্যজনক ভাবেই কমে যায়। অর্থাৎ দুর্ঘটনা, যুদ্ধক্ষেত্র বা হঠাৎ করে কেউ যদি মারা যাওয়া ব্যক্তির জীবনের সঙ্গে যখন কারও পূর্বজন্মের স্মৃতি মিলে যায়, সেক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি এবং পূর্বজন্মের স্মৃতি তুলে ধরা ব্যক্তির জন্মের মধ্যেকার অন্তর্বর্তী সময়ের ব্যবধান ছিল তুলনামূলক কম, গড়ে মাত্র ১২ মাস। অথচ মৃত্যু নিশ্চিত ছিল, এমন ক্ষেত্রে ওই ব্যবধান গড়ে ২১ মাস ছিল। দেখা যায়, মৃত্যু যতটা আকস্মিক, যতটা অপ্রত্যাশিত, অন্তর্বর্তীকালীন সময়কালের ব্যবধান ততটাই সংক্ষিপ্ত। অর্থাৎ আকস্মিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে শিশুর জন্মের ব্যবধান কমে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: জোড়া ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল তিব্বত, মাটি কাঁপল চিনেরও, নেপালে বিপর্যয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই

এর বিপরীতে সম্ভাব্য যুক্তি হিসেবে সাংস্কৃতিক প্রভাবের কথা উঠতেই পারে। পুনর্জন্মে বিশ্বাস করেন যাঁরা, তাঁরা এই ধরনের চর্চাকে জিইয়ে রাখেন। তাই স্মৃতি বিকৃতি, পারিবারিক প্রভআব, সামাজিক মর্যাদা, গেঁথে থাকা বিশ্বাস, সব কিছুই খতিয়ে দেখেন গবেষকরা। তাতে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সময়কাল কমে আসার প্রবণতা সেই সব পরিবারের ক্ষেত্রে বেশি স্পষ্ট, যাঁদের ধর্মবিশ্বাসে পুনর্জন্মের কোনও স্থান নেই। তাই পূর্বজন্মের স্মৃতি নিয়ে যে সব কাহিনি শোনা যায়, সামাজিক বিশ্বাস সেগুলির চালিকাশক্তি, অথবা সেগুলি কোনও ধর্মীয় বা সামাজিক বিশ্বাসের ফলবলে মনে করছেন না ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়ার গবেষক ফিলিক কোজোলিনো। 

আরও একটি বিষয় নজর কেড়েছে গবেষকদের, যা হল, বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখাগিয়েছে, ৫৭ শতাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুকে অপ্রত্যাশিত বলে গণ্য করা হয়। ৬৮ শতাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুকে গণ্য করা হয় অপ্রত্যাশিত বলে। অস্বাভাবিক ও অপ্রত্যাশিত মৃত্য়ুর এই হার সাধারণ মৃত্যুহারের চেয়ে পরিসংখ্যানগত ভাবে অনেকটাই বেশি। এছাড়াও, গত ব্যক্তি, অর্থাৎ যাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করা হচ্ছে, মৃত্যুর সময় তাঁর বয়সও অনেকটাই কম ছিল, মাত্র ৩০ বছর। এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হননি গবেষকরা। তবে তাঁদের মতে, এই সূত্র ঘরে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ ঘটনার ব্যাখ্য়া সম্ভব। ব্যক্তিগত বা অন্য কোনও নির্দিষ্ট বিষয় থাকতে পারে এক্ষেত্রে। তবে মৃত্যুর পরও চেতনার অস্তিত্ব টিকে থাকে কি না, তা এর দ্বারা প্রমাণিত হয় না।

গবেষকদের মতে, এই গবেষণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এতে এক ধরনের সংযোগকেই তুলে ধরা হয়েছে। তবে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে শিশুর জন্মের সময়ের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি হয়, এমন কিছু নেই। তবে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং উত্তর আমেরিকার জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষের যে বিশ্বাস, তার সঙ্গে মিলে যায় অনেকটা। কারণ তাঁদের বিশ্বাস, হঠাৎ কেউ মারা গেলে, তাঁর অনেক কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেই অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করতেই পুনর্জন্ম হয়। কিন্তু এই গবেষণা কোনও অলৌকিক যোগসূত্রের প্রমাণ নয় বলেই জানিয়েছেন গবেষকরা। বরং আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মত তাঁদের।