নয়াদিল্লি: কাগজের ব্যাটারি তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা। ওষুধের মতো মুখে দিয়ে গিলে নিলেই হল। শরীরের মধ্যে থাকা মেডিক্যাল ডিভাইসগুলিকে চালু থাকবে। আপনা থেকেই গলে যাবে কাজ শেষ হয়ে গেলে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে এ এক যুগান্তকারী সূচনা বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। (Paper Battery For Internal Medical Devices)
সোমবার Nature Chemical Engineering জার্নালে কাগজের ব্যাটারির খুঁটিনাটি তুলে ধরেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা জানিয়েছেন, শরীরের মধ্যে থাকা মেডিক্যাল ডিভাইস সক্রিয় রাখতে বর্তমানে যে ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়, তা শুধু আকারেই বড় নয়, সেগুলিকে সিল করে রাখতে হয়, যাতে ভিতরের মালমশলা চুইয়ে না পড়ে, শরীরের কোনও ক্ষতি না হয়। (Medical Science)
ওই ঝুটঝামেলা থেকে সকলকে মুক্তি দিতেই কাগজের ব্যাটারি তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা, যা একেবারে নিরাপদ। মুখে দিয়ে গিলে নিলেই হল। সেটি এমন সব উপাদান দিয়ে তৈরি, যা শরীরের পরিপাকতন্ত্রের অম্ল পরিবেশে ধীরে ধীরে গলে যায়। ওই ব্যাটারিতে কোনও বিষাক্ত বা ক্ষতিকর উপাদান নেই। একেবারে নিরাপদে শরীর শুষে নেয় ওই ব্য়াটারিকে।
আপাতত শূকরের শরীরে ওই ব্যাটারি পরীক্ষা হয়েছে। শূকরের শরীরে বসানো মেডিক্যাল ডিভাইসকে তিন দিন চালু রেখেছিল কাগজের ব্যাটারি। আগামী দিনে মানুষের শরীরেরও প্রয়োগের চিন্তাভাবনা রয়েছে। এর ফলে টেম্পোরারি মেডিক্যাল ডিভাইসগুলিকে চালু রাখা সহজ হবে। আবার ব্যাটারি বের করতে বা বসাতে আলাদা করে অস্ত্রোপচারও করতে হবে না। ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ডের অধ্যাপত রেজা গডসি বলেন, “অত্যন্ত ভাল খবর। শরীরের ভিতর কোনও যন্ত্র বসানোর ক্ষেত্রে ব্যাটারিই অনেকটা জায়গা দখল করে নেয়। তাই ক্যাপসুলের আকারের কিছু যদি প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করতে পারে, তা অত্যন্ত ভাল খবর।” রেজা এই গবেষণায় যুক্ত নন।
আরও পড়ুন: নতুন আইফোন বুঝি? হ্যাঁ বলতেই সর্বনাশ হল, তরুণীর হাত থেকে iPhone 18 Pro ছিনিয়ে পালাল ২ ছিনতাইকারী
রক্তক্ষরণ শনাক্ত করতে, ওষুধ প্রয়োগ করতে এবং শরীরের কোও নির্দিষ্ট অঙ্গ বা টিস্যুকে উদ্দীপীত করতে মানুষের শরীরের ভিতর ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের যন্ত্র বসানো হয়। কাগজের তৈরি ব্য়াটারিও সেগুলিকে চালু রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। জানা গিয়েছে, ব্যাটারিতে বেশ কয়েকটি আস্তরণ রয়েছে। ব্যাটারির অ্যানোড বা ঋণাত্মক প্রান্ত তৈরি করা হয়েছে ম্যাগনেসিয়াম শঙ্কর ধাতু দিয়ে। ক্যাথোড বা ধনাত্মক প্রান্তটি তৈরি করা হয়েছে মলিবডেনাম ট্রাই-অক্সাইড এবং অ্যাক্টিভেটেড কার্বন দিয়ে। দুই প্রান্তের মধ্যিখানে জৈব-বিয়োজ্য ইলেক্ট্রোলাইট রয়েছে, যা বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরিতে সাহায্য় করে। স্বল্পমেয়াদি প্রয়োজনে শরীরে চিকিৎসাযন্ত্র ধারণ করতে, ওই ব্যাটারিই প্রবেশ করানো হয়েছিল শূকরের শরীরের।
ব্যাটারিতে সোলুলোজ় ন্যানোফাইব্রিল বাইন্ডার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। পাতলা, ছিদ্রযুক্ত, কাগজের মতো ব্যাটারিতে পরিণত করা হয়েছে সেটিকে। আগে বড় আকারের বাইন্ডার ব্যবহার করা হতো। MIT-র ল্যাবরেটরি ফর ট্রান্সলেশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ডিরেক্টর এবং গবেষণার যুক্ত জিওভানি ট্রাভার্সো জানিয়েছেন, কাগজের মতো কাঠামোটি ব্যাটারির শক্তি বৃদ্ধি করে। রোধ করে ক্ষয়। পাশাপাশি, বিদ্যুৎও উৎপাদন করে। পাকস্থলীতে মজুত অ্যাসিডে যাতে দ্রুত নষ্ট না হয়ে যায়, তার জন্য উপরিভাগে মৌমাছির তৈরি মোমের প্রলেপ রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষার জন্য রয়েছে ক্যান্ডেলিলা মোমের আস্তরণও, যা মরুভূমির গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ ইউফোরবিয়া অ্যান্টিসিফিলিটিকা (Euphorbia antisyphilitica) থেকে সংগ্রহ করা হয়। জিওভানির কথায়, “মোমের প্রলেপ শুধুমাত্র মোড়ক নয়। ব্যাটারির আয়ুকাল নিয়ন্ত্রণ করে সেটি।”
দু’রকমের ব্যাটারি তৈরি করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। একটি আকারে এতটাই ছোট ছিল যে সাধারণ জিলেটিন ক্যাপসুলের ভিতর দিব্যি এঁটে যেতে পারে। পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেটি প্রায় ১.৭৭ ভোল্ট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। প্রতি বর্গসেন্টিমিটারে ২ মিলিঅ্যাম্পিয়ার বিদ্যুৎ সঞ্চয় এবং সরবরাহ করতে পারে, স্বল্প শক্তির যন্ত্র চালু রাখার জন্য যা যথেষ্ট। তুলনামূলক বড় আকারের যে ব্যাটারি তৈরি করা হয়, সেটি ১.৮৪ ভোল্টের বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে পারে এবং সর্বোচ্চ ৩.৫ মিলিঅ্যাম্পিয়ার বিদ্যুৎ সঞ্চয় এবং সরবরাহ করতে পারে। তবে ব্যাটারির শক্তি আরও বৃদ্ধি করতে চান বিজ্ঞানীরা।
3D প্রিন্টেড ক্যাপসুলের মধ্যে ব্য়াটারি পুরে দিয়ে তা শূকরের শরীরে পুরে দেওয়া হয়। দুই ধরনের ব্যাটারিই তিন দিন পর্যন্ত কাজ করে। ধীরে ধীরে ভোল্টেজ এবং ক্ষমতা কমতে শুরু করে। ব্যাটারির জৈব পচনশীল অংশগুলি শূকরের শরীরে মিশে গেলেও, পরীক্ষায় ব্যবহৃত ইলেকট্রিক সার্কিড বোর্ডটি অক্ষত ছিল। প্রাকৃতিক উপায়েই সেটি বেরিয়ে আসে শূকরের শরীর থেকে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রত্যেকটি অংশ জৈব-পচনশীল উপাদান দিয়ে তৈরি করে তোলা গেলে কিছুই আটকে থাকবে না শরীরে। ব্যাটারিটি নিয়ে এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে।
