সন্দীপ সরকার, কলকাতা: ঘটনা এক, ইডেন গার্ডেন্সে (Eden Gardens) দ্বিতীয় ডিভিশন চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে সুবার্বান ক্লাবের বিরুদ্ধে বেহালা ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন ক্লাবের ইনিংসের প্রথম ওভার। দ্বিতীয় বলেই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের শিকার ব্যাটার আশিস বেরা। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ব্যাটারের তিনটি স্টাম্প। লেগস্টাম্পের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার মুখে বল লাগল ব্যাটারের প্যাডে। উইকেটকিপার আবেদনও করলেন না। বোলারের এলবিডব্লিউয়ের ক্ষীণ আবেদনে সাড়া দিয়ে আঙুল তুলে দিলেন আম্পায়ার। হতচকিত গোটা মাঠ। আশিস বিশ্বাসও করতে পারছিলেন না যে, আম্পায়ার তাঁকে আউট দিয়েছেন। যে সিদ্ধান্তে বেহালা ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন ক্লাবের সকলে মুষড়ে পড়লেন। সেই ধাক্কা গোটা ইনিংসে কাটিয়ে ওঠা গেল না।

ঘটনা দুই, সুবার্বান ক্লাবের অলোক শর্মা তখন সামান্য রানে ব্যাট করছেন। এলবিডব্লিউয়ের জোরাল আবেদন নাকচ হয়ে গেল। আম্পায়ারের বদান্যতায় বেঁচে যান অলোক। সেঞ্চুরি করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি।

ঘটনা তিন, অন্তত দুবার সুবার্বান ক্লাবের প্রতীক দত্ত লো ফুলটসে পরাস্ত হন। উইকেটের সামনে বল ব্যাটারের প্যাডে লাগতেও আউটের আবেদন নাকচ হয়ে যায়। মাঠে হাজির সকলেই বলছেন, নিশ্চিত আউট।

পাড়ার আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্টেও এরকম দৃশ্য দেখা গেলে বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। সেখানে সিএবি-র দ্বিতীয় ডিভিশন লিগের চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত দেওয়া হল। যে ম্যাচের ওপর নির্ভর করেছিল, কোন দল পরের মরশুমের জন্য প্রথম ডিভিশনে খেলার ছাড়পত্র পাবে, সেখানে আম্পায়ারিং নিয়ে হুলস্থুল পড়ে গিয়েছে। ম্যাচ জিতে পরের মরশুমে প্রথম ডিভিশনে খেলার টিকিট কনফার্ম করেছে সুবার্বান ক্লাব।

অনেকে অবাক হচ্ছেন কারণ, ইডেনে খেলা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বোর্ডের ম্যাচ করানো আম্পায়ার সত্রাজিৎ লাহিড়িও। ফের কাঠগড়ায় স্থানীয় ক্রিকেটের আম্পায়ারিং। শুধু উপরে উল্লিখিত তিনটি ঘটনাই নয়, স্থানীয় ক্রিকেটে আম্পায়ারিংয়ের ভুলের এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ উঠে এসেছে গোটা মরশুম জুড়ে। বলা হচ্ছে, আম্পায়ারিংয়ের মান এরকম তলানিতে পড়ে গেলে ভাল ক্রিকেট হবে কোথা থেকে!

যে আম্পায়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁর একাধিক কাণ্ডকারখানা ময়দানে তোলপাড় ফেলেছে। যার বেশ কয়েকটি ফুটেজও রয়েছে এবিপি আনন্দের হাতে।

সবচেয়ে শোরগোল পড়েছে সল্ট লেকের ভিডিওকন (টোয়েন্টি টু ইয়ার্ডস) মাঠে জে সি মুখোপাধ্যায় ট্রফির একটি ম্যাচকে ঘিরে। সেই মাঠে ম্যাচ পরিচালনা করতে গিয়ে ৩০ গজের বৃত্তকে ছোট করে ২৫ গজের করে দেন অভিযুক্ত আম্পায়ার সত্রাজিৎ! যা দেখে মাঠে উপস্থিত সকলে চমকে উঠেছিলেন বললেও কম বলা হয়। নিয়ম কীভাবে বদলে দেওয়া যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। সেই ম্যাচটি শেষ হওয়ার পর ওই মাঠে সেদিনই দ্বিতীয় ম্যাচের আগে তড়িঘড়ি ফের সেই বৃত্ত বাড়িয়ে নির্ধারিত মাপের অর্থাৎ ৩০ গজের করে দেওয়া হয়।

উঠছে আরও এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। শোনা যাচ্ছে, ফাইনাল ম্যাচের আগে বেহালা ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন ক্লাবের কয়েকজন ক্রিকেটারকে ডেকে নিয়ে কথা বলেছিলেন সুবার্বান ক্লাবের এক কর্মকর্তা। কী আলোচনা হয়েছিল? সন্দিহান অনেকেই।

ইডেনে দ্বিতীয় ডিভিশন চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের খবর মাঠ থেকেই জানানো হয় সিএবি প্রেসিডেন্ট স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়কে। ভিডিও তুলে পাঠানো হয় তাঁকে। শোনা যাচ্ছে, দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছেন স্নেহাশিস। গোটা ঘটনা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন প্রাক্তন ক্রিকেটার।

আঙুল উঠছে আম্পায়ারিং সাব কমিটির চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেও। স্থানীয় ক্রিকেটে একাধিক বিতর্কে এর আগেও নাম জড়িয়েছে তাঁর। শোনা গেল, তাঁকেও বিতর্কিত আম্পায়ারিংয়ের ভিডিও পাঠানো হয়। দেখে তিনি নাকি 'ঘটনাটি দুর্ভাগ্যজনক' বলে দায় সেরেছেন। বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, ভিডিও দেখার পর আম্পায়ারিং সাব কমিটির চেয়ারম্যানকে ফোন করেছিলেন ক্ষুব্ধ সিএবি প্রেসিডেন্ট।

সামনেই বেঙ্গল প্রো টি-২০ টুর্নামেন্ট। যে টুর্নামেন্টের জন্য ক্রিকেটারদের ড্রাফটিং হয়ে গিয়েছে। জানা গেল, এই টুর্নামেন্টে ডিআরএস প্রযুক্তি চালু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছেন আম্পায়ারিং সাব কমিটির চেয়ারম্যান। কিন্তু কেন? সদুত্তর নেই।

 

এটাও আউট! প্রশ্ন ময়দানের

সিএবি-র কেউ কেউ বলছেন, অন্যান্য রাজ্যের মতোই ক্রিকেটার তুলে আনার জন্য করা হচ্ছে এই টুর্নামেন্ট। সেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার হলে ক্রিকেটের মান আরও বাড়ত বৈকি! পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও কেন ডিআরএস ব্যবহারে আপত্তি জানানো হল!

সিএবি-র একটা বড় অংশ দাবি করছে, সংস্থার হাতে ম্যাচ পরিচালনার মতো দক্ষ আম্পায়ার থাকলেও তাঁদের বড় ম্যাচে কাজে লাগানো হচ্ছে না। বরং আম্পায়ারিং সাব কমিটির চেয়ারম্যানের পছন্দের লোককে ম্যাচ পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। শোনা গেল, সিএবি প্রেসিডেন্ট স্নেহাশিস, এমনকী সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও গোটা ঘটনায় বিরক্ত। পরের মরশুমে কিছু বদল আনার কথাও ভাবা হচ্ছে। এর আগে সৌরভ সিএবি-র পদে থাকাকালীন আম্পায়ারিংয়ের মান উন্নত করতে আম্পায়ারদের টুপিতে ক্যামেরা লাগানোর বন্দোবস্ত করেছিলেন। সেরকম কিছু কি ফের চালু করা যায় না?

অপেক্ষায় ময়দান।