কলকাতা: ১৮ বছরের কম বয়সি শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও কঠোর সুরক্ষা ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। শিশুদের জন্য ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতী নয় দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আর এখানে মূল প্রশ্ন হল, ১৮ বছরের কম বয়সিরা নিজের নামে স্বাধীনভাবে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খুলতে এবং সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের শর্তাবলিতে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে কি না। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক কার্যপ্রণালীতে এই বিষয়টির সম্ভাবনা নিয়ে কেন্দ্রকে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।

Continues below advertisement

আরও পড়ুন: জঙ্গি মডিউলের খোঁজে রাজ্য জুড়ে তল্লাশিতে NIA, যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার বজবজের যুবক

কী বলেছে সুপ্রিম কোর্ট?

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার উপস্থিতিতে এই মামলা ওঠে। বেঞ্চ কেন্দ্রকে ভাবতে বলেছে, বিদ্যমান আইনের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আরও কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় কি না।

Continues below advertisement

বিচারপতি বাগচি জোর দিয়ে বলেন, বিষয়টি শুধুমাত্র নির্দেশিকা হিসেবে না রেখে আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে। কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানান, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা যেতে পারে এবং পদক্ষেপ করাও হবে।

এই মামলায় Indian Contract Act-এর ১১ নম্বর ধারার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওই ধারায় চুক্তি করার ক্ষেত্রে ব্যক্তির আইনগত সক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। Just Rights for Children Alliance (JRCA)-এর করা আবেদনে বলা হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ব্যবহারকারীকে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের শর্তাবলী মেনে নিতে হয়। ফলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের চুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থার একটি প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

আবেদনকারীদের বক্তব্য, শিশুদের সুরক্ষায় নতুন তথ্য সুরক্ষা আইন কার্যকর হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করেও বিদ্যমান আইনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। মামলায় সম্ভাব্য একটি ব্যবস্থা হিসেবে অভিভাবক বা আইনগত অভিভাবকের সম্মতি নেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সি কোনও ব্যক্তি সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট তৈরি করলে বাবা-মা বা অভিভাবকের অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে অভিভাবকের পরিচয় যাচাই বা e-KYC ব্যবস্থার কথাও প্রস্তাবে রয়েছে। সলিসিটর জেনারেলও এমন একটি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে ভাবার কথা জানিয়েছেন, যেখানে প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে চুক্তির সম্পর্কটি অভিভাবকের মাধ্যমে তৈরি হতে পারে।

বর্তমানে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিজেদের ন্যূনতম বয়স সংক্রান্ত নীতি অনুসরণ করে। আবেদনে ফেসবুক ও চ্যাটের মতো প্ল্যাটফর্মের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ১৩ বছর বয়স থেকেই অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আলোচনায় উঠে আসা প্রস্তাব কার্যকর হলে প্ল্যাটফর্মগুলিকে ভারতীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা তৈরি করতে হতে পারে। বয়স যাচাই, অপ্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাকাউন্ট পরিচালনা এবং অভিভাবকের সম্মতি নেওয়ার মতো বিষয়গুলিও তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

JRCA-এর আবেদনে শিশুদের অনলাইন প্রলোভন, যৌন শোষণ, পাচার, যৌন নিপীড়নের মাধ্যমে অর্থ আদায়, সাইবার বুলিং, আচরণগত তথ্য বিশ্লেষণ, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং বয়সের অনুপযুক্ত বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের যৌন নির্যাতন ও শোষণমূলক বিষয়বস্তুর বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনি বিধিনিষেধ কার্যকর করতে বয়স যাচাই ও স্বয়ংক্রিয় ছাঁকনি ব্যবস্থার যথাযথ প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

আরও পড়ুন: কলকাতা থেকে মালদা, পুজোর আগে রাজ্য জুড়ে রাস্তার মরণফাঁদ, চলছে মেরামতির কাজও

এখন কেন্দ্রকে খতিয়ে দেখতে হবে, সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য ডিজিটাল মধ্যস্থতাকারীদের নিয়ন্ত্রণকারী আইনি কাঠামোর মধ্যে কীভাবে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করা যায়। পরবর্তী শুনানিতে এই বিষয়ে কেন্দ্রের অবস্থান ও পদক্ষেপের কথা সামনে আসতে পারে।

এই মামলার তাৎক্ষণিক প্রশ্ন শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার বন্ধ করা নয়। বরং ১৮ বছরের কম বয়সিদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, বয়স যাচাই এবং অভিভাবকের সম্মতি কীভাবে ভারতীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়, সেটিই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। কেন্দ্রের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলির জন্য নতুন বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে কি না, তা স্পষ্ট হবে।