নয়াদিল্লি: বিষ খাইয়ে স্বামীকে হত্যার অভিযোগ। প্রথম বা দ্বিতীয় স্বামীকে নয়, সবমিলিয়ে ১১ জন স্বামীকে খুনের অভিযোগ মহিলার বিরুদ্ধে। খুনের পর স্বামীর সম্পত্তিও হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই মুহূর্তে খবরের শিরোনামে ইরানের ‘ব্ল্যাক উইডো’ (Black Widow). আদালত তাঁকে কী শাস্তি দেয়, সেদিকে তাকিয়ে গোটা পৃথিবী। তবে নিহতদের পরিবারের লোকজন ফাঁসির দাবি তুলছেন। (Iran Black Widow)
৫৬ বছর বয়সি কুলসুম আকবরি। ২০২৩ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সেবার ৮২ বছর বয়সি স্বামীকে হত্যার সন্দেহে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হওয়ার পর, আগের ১০ স্বামীকেও হত্যার কথা স্বীকার করে নেন কুলসুম। তদন্তকারীদের দাবি, সবমিলিয়ে ১৯ বার বিয়ে করেন কুলসুম। এর বাইরে ১৮ জন পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তাঁর। কতজনকে খুন করেছেন, সেব্যাপারে নিশ্চিত নন কুলসুম নিজেও। তাঁর বক্তব্য, “জানি না ঠিক কত জন। ১৩ বা ১৫ হতে পারে। ঠিক মনে নেই।” (Iran Serial Killer)
১১ জন স্বামীকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন কুলসুম। যদিও তদন্তকারীদের সন্দেহ, বাস্তবে সংখ্যাটা আরও বেশি হতে পারে। কুলসুমের হাতে অন্তত ২০ জন পুরুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলে দাবি উঠছে। কুলসুমকে ‘সিরিয়াল কিলার’ বলেও উল্লেখ করছেন কেউ কেউ। মাহিন কাদরির পর ইরানের ইতিহাসে কুলসুমই দ্বিতীয় সিরিয়াল কিলার বলে দাবি তাঁদের। মাহিন ছ’জনকে খুন করে। ২০১০ সালে তার ফাঁসি হয়।
কিন্তু ১১ জন পুরুষকে একাহাতে কুলসুম খুন করলেন কী করে? তদন্তকারীরা জানিেছেন, খাবারে বিষ মিশিয়ে দিতেন কুলসুম। ডায়বিটিসের ওষুধ থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যালকোহল, ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিতেন খাবারে। এমনকি যৌন সুখবৃদ্ধির ওষুধের ওভারডোজও দিতেন কুলসুম। প্রবীণ দেখেই বিয়ে করতেন কুলসুম। বিষও মেশাতেন একটু একটু করে, যাতে অসুস্থ হতে হতে একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তেন সকলে। ফলে বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে বলেই মেনে নিতেন সকলে। সন্দেহের কোনও অবকাশ থাকত না। প্রবীণ স্বামীর মৃত্যুর পর টাকা-পয়সা, সম্পত্তি সব প্রথমে নিজের মেয়ের নামে হস্তান্তরিত করতেন। এভাবেই সম্পত্তি বাড়াতেন তিনি।
কিন্তু সাধারণ পরিবারের মেয়ে কুলসুম এত দুঃসাহস পেলেন কোথা থেকে? ইরানের সংবাদমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সে প্রথম বিয়ে হয় কুলসুমের। কিন্তু সেই বিয়ে সুখের হয়নি। মানসিক সমস্যা ছিল স্বামীর। অতি অল্প দিনই টেকে সেই বিয়ে। দ্বিতীয় বার বয়সে অনেক বড় এক পুরুষের সঙ্গে বিয়ে হয়। ওই ব্যক্তির আগের পক্ষের সন্তানদেরও মানুষ করতেন কুলসুম। কিন্তু দিনের শেষে স্বামী, সৎ ছেলেরা তাঁকে মারধর করত।
দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর পর মহিলাদের বিভিন্ন জমায়েতে অংশ নিতে শুরু করেন কুলসুম। প্রবীণ ও একাকী পুরুষদের বিয়ে করতে ইচ্ছুক বলে সেখানে জানান তিনি। আর্থিক অবস্থা দেখে সেই মতো বেশি বয়সি, একাকী পুরুষদের সঙ্গে আলাপ জমাতে শুরু করেন। বিয়ের সময় স্বামীদের থেকে প্রচুর পণও নিতেন তিনি। আবার বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই বিষ দিতে শুরু করতেন। কোনও কারণে ওষুধ কাজ না করলে বালিশ বা তোয়ালে দিয়ে মুখ চেপেও হত্যা করতেন। ইরানের উত্তরের সারি, নেকা, মাহমুদাবাদ, বাবোল, কায়েমশহরে পর পর এমন ঘটনা ঘটান কুলসুম।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, কুলুসুমের এক স্বামী মিরামাদ ওমরানি ৬৯ বছর বয়সে, ২০১৩ সালে বিয়ের এক মাস পরই মারা যান। ২০১৬ সালে বিয়ের দু’মাস পর মারা যান ৬২ বছর বয়সি ইসমাইল বখশি, বিয়ের ৪৩ দিন পর মারা যান ৮৩ বছর বয়সি গনজ়ালি হামজেই। ২০২০ সালে মাসিহ্ নেমাতি কোনও রকমে প্রাণে বেঁচে যান। তাঁকে বিষ মেশানো সরবত দিয়েছিলেন কুলসুম। বিষয়টি বুঝতে পেরে কুলসুমকে বাড়ি থেকে তাডি়য়ে দেন মাসিহ্। কিন্তু থানায় অভিযোগ করেননি। ২০২৩ সালে আজিজোল্লা বাবেই নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলের সন্দেহ গিয়ে পড়ে কুলসুমের উপর। তাতেই ধরা পড়ে যান কুলসুম।
একেবারে শুরুতে অভিযোগ অস্বীকারই করেছিলেন কুলসুম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সমস্ত তথ্য়প্রমাণ তাঁর বিরুদ্ধে যেতে শুরু করে। তাঁর হাতে খুন হওয়া ব্যক্তিদের উত্তরাধিকারী হিসেবে আদালতে পৌঁছন বহু মানুষ। সরাসরি কুলসুমের বিরুদ্ধে মামলা করেন ৪৫ জন, যাঁরা কেউ নিহতের উত্তরাধিকারী, কেউ আবার আত্মীয়। কুলসুমের আইনজীবী তাঁকে মানসিক ভাবে অসুস্থ বলেও উল্লেখ করেন। কিন্তু সেই যুক্তি মানেননি মামলাকারীরা। বুধবার যখন আদালতে তোলা হয় কুলসুমকে, তাঁর ফাঁসি চেয়ে সরব হন সকলে। শেষ পর্যন্ত কুলসুমের মৃত্যুদণ্ড হয় কি না, সেদিকেই তাকিয়ে সকলে।