প্রসূন চক্রবর্তী , বাঁকুড়া : ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। বাঁকুড়ার শালতোড়ার এক সাধারণ গ্রামবাংলার বাড়িতে দিনের শুরু হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। রান্নাঘরে নিজের হাতে চা বানাচ্ছেন চন্দনা বাউরি ( Chandana Bauri )। পরিবারের লোকজনকে চা দিয়ে, ঘরের ছোটখাটো কাজ সামলে প্রস্তুতি নিচ্ছেন কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার। কারণ আজ নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠক রয়েছে বিজেপি বিধায়কদের সঙ্গে।
রাজমিস্ত্রীর জোগাড় থেকে বিধায়ক, বদলায়নি চন্দনা বাউরির জীবনযাপন
দ্বিতীয়বারের জন্য বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। কিন্তু সেই সাফল্য তাঁর জীবনযাপনে এতটুকুও বদল আনতে পারেনি। এখনও তিনি সেই চেনা গ্রামের গৃহবধূ, যিনি একসময় স্বামী শ্রাবণ বাউরির সঙ্গে রাজমিস্ত্রীর জোগাড়ের কাজ করতেন।
সংগ্রামের ভিতর থেকেই উঠে আসা
বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের কেলাই গ্রামের অত্যন্ত সাধারণ পরিবারে জীবন কেটেছে চন্দনা বাউরির। সংসারের টানাপোড়েন, অভাব, অনিশ্চয়তা—সবকিছুর মধ্যেই দিন গিয়েছে। স্বামী পেশায় রাজমিস্ত্রী। সংসার চালাতে তাঁর সঙ্গেই জোগাড়ের কাজ করতেন চন্দনা। ছোটবেলায় রাজনীতির সঙ্গে যোগ ছিল না। কিন্তু চারপাশে অন্যায়, অত্যাচার এবং সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে রাজনীতির পথে টেনে আনে। বিজেপির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ধীরে ধীরে সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
২০২১ সালে শালতোড়া বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তাঁকে প্রার্থী করে বিজেপি। তখন অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। এক সাধারণ গৃহবধূ, যাঁর কোনও রাজনৈতিক প্রভাব বা অর্থবল নেই, তিনি কি ভোটে লড়তে পারবেন? কিন্তু সেই নির্বাচনে তৃণমূলের প্রবল ঝড়ের মধ্যেও জয় ছিনিয়ে আনেন চন্দনা বাউরি। এরপর ২০২৬-এ দল ফের তাঁর উপর ভরসা রাখে। সেই আস্থার মর্যাদা রেখে দ্বিতীয়বারের জন্য আরও বড় ব্যবধানে জয়ী হন তিনি।
জয় এসেছে, বদলাননি মানুষটা
দু’বারের বিধায়ক হয়েও তাঁর জীবন এখনও মাটির কাছাকাছি। বাড়িতে আজও কোনও বিলাসিতা নেই। নিজের হাতে সংসারের কাজ করেন। এখনও গ্রামের মানুষজন অবলীলায় তাঁর বাড়িতে ঢুকে পড়েন, কথা বলেন, সমস্যা জানান। বিধায়ক হওয়ার পরেও নিজের বাড়ি তৈরি করতে আলাদা করে সামর্থ্য ছিল না। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার বাড়িটিও স্বামী-স্ত্রী মিলে নিজেরাই তৈরি করেছেন। চন্দনা বাউরীর কথায়, “আমি যখন রাজনীতিতে আসি, তখন তৃণমূলের অত্যাচার দেখে সিদ্ধান্ত নিই যে আমায় লড়তে হবে। আমায় দেখে যেন আরও মহিলারা সাহস পান।”
কখনও সাইকেল চেপে, কখনও হেঁটে, কখনও সাধারণ মানুষের বাড়িতে গিয়ে প্রচার করেছেন। রাজনীতি তাঁর কাছে ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং বেঁচে থাকার লড়াইয়েরই একটা অংশ।
প্রতিশ্রুতির ভার এখন কাঁধে
নির্বাচনে জেতার উচ্ছ্বাসের মধ্যেও নিজের প্রতিশ্রুতিগুলো ভুলে যাননি চন্দনা। তাঁর এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য শালতোড়ার উন্নয়ন। দামোদর নদের উপর পাকা সেতু নির্মাণ, প্রত্যেক বাড়িতে পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া, বন্ধ হয়ে থাকা পাথর শিল্পকে ফের সচল করা—এই বিষয়গুলোকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন তিনি। শুধু তাই নয়, এলাকার পরিযায়ী শ্রমিকদেরও ঘরে ফেরানোর স্বপ্ন দেখছেন। তাঁর পরিকল্পনা, স্থানীয় স্তরে এমন কাজের সুযোগ তৈরি করা যাতে মানুষকে আর ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে না হয়। চন্দনা জানেন, সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। তবে রাজমিস্ত্রীর জোগাড়ের কাজ করা সেই মেয়েটি আজও বিশ্বাস করেন—মানুষ পাশে থাকলে অসম্ভব বলেও কিছু হয় না।
আরও পড়ুন : গোটা অপারেশনের পিছনে তাহলে এই ব্যক্তিই ? চন্দ্রনাথ খুনের পর্দাফাঁস হল?
