কলকাতা: আইপ্যাকের অফিসে নির্বাচন কমিশনের তল্লাশি ঘিরে সকাল থেকে নাটকীয় পরিস্থিতি। তৃণমূলের নির্বাচনী তথ্য, প্রার্থিতালিকা, কৌশল সংক্রান্ত নথি হাতাতেই অমিত শাহ এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট-কে কাজে লাগিয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন মমতা। আর সেই আবহেই একেবারে বলিষ্ঠ ভূমিকায় দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহকে যেমন আক্রমণ করলেন, তেমনই ED এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুললেন। আইপ্যাকের দফতর থেকে যে নথি গাড়িতে তোলা হয়, সেগুলি তৃণমূলের কাগজ, সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল বলে জানান তিনি। তৃণমূলের আইটি সেল এবং সাংগঠনিক বহু কাজকর্মই সামলায় আইপ্যাক। তাই মমতার অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে তল্লাশি চালানো হচ্ছে ED-কে দিয়ে, তৃণমূলের তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। (Mamata Banerjee)
ED হানার খবর পেয়ে এদিন সকালে প্রথমে প্রতীকের বাড়িতে পৌঁছন মমতা। এর পর সটান সল্টলেকে আইপ্যাকের অফিসে পৌঁছে যান তিনি। আইপ্যাকের অফিসে ED গেলে মমতা কেন যাবেন, সেই নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু এদিন সল্টলেকে আইপ্যাকের অফিস থেকে বেরিয়ে মমতা গোড়াতেই জানিয়ে দেন, আইপ্যাক শুধুমাত্র কোনও বেসরকারি সংস্থা নয়, আইপ্যাক তৃণমূলের স্বীকৃত টিম। সেই টিমের থেকে সব কাগজ ছিনিয়ে নেওয়া, কাগজ লুঠ করা বেআইনি কাজ। (ED Raids at IPAC)
ED কী কী নিয়ে গিয়েছে, তাও জানান মমতা। তিনি বলেন, "নির্বাচনের পুরো রণকৌশল ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছে। একটা পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের সঙ্গে লড়তে না পারলে বাংলায় আসেন কেন। হিম্মত রাখুন! গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে লড়াই করুন। এজেন্সি দিয়ে আমাদের কাগজ লুঠ করেন? আমাদের রণকৌশল, ডেটা লুঠ, ভোটার, বাংলাকে লুঠ করেন? এতে আরও খারাপ পরিস্থিতি হবে। যে ক'টি আসন জিতেছিলেন, শূন্যে নেমে আসবেন। আর মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার, কন্ট্রোল ইওর হোম মিনিস্টার।"
মমতা আরও বলেন "ED-র ফরেন্সিক টিম এসেছিল। ওরা কিছু ট্রান্সফার করেছে। এখন বলছে, করেনি। কিন্তু আমি দেখেছি। আমাদের হার্ড ডিস্ক, আমাদের অর্থনৈতিক নথি, রাজনৈতিক নথি নিয়ে নিয়েছে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে আমাদের, আয়কর দিই আমরা। এর পরও...বিজেপি এত বড় ডাকাত যে, যাদের কাছে কিছু ছিল না, এখন হাজার হাজার কোটির ওয়াকফ সম্পত্তি। বাংলায় তো সবচেয়ে বড় বড় ডাকাত রয়েছে ওদের। কউ সিবিআই হল না তো! এক শান্তনু ঠাকুর, কলকাতায় মামললায় নাম রয়েছে। তার পরও কিছু করেনি। ED কিছু করেনি। গদ্দারের বিরুদ্ধে কী করেছে! আমার সব জানি। সৌজন্যতা দেখাই আমরা। তাই বলে আমরা দুর্বল নই। আমরা সংস্কৃতি মনোভাব সম্পন্ন মানুষ। বাংলা দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী। কিন্তু আমাদের জ্বালাবেন, সব লুঠ করে নেবেন, ছিনিয়ে নেবেন, চুরি করবেন, তা হজম করতে পারব না।"
সল্টলেকে আইপ্যাকের অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে মমতা বলেন, "আপনারা জেনে রাখুন এই অপারেশনটা শুরু করেছে ভোর ৬টা থেকে, যখন অফিসে কেউ ছিল না প্রায়। তারা এসে আমাদের পার্টির সব ডেটা, সমস্ত ল্যাপটপ, যাতে সব নির্বাচনী কৌশল, তথ্য আছে, SIR সংক্রান্ত কাজের নথি, মানুষকে সাহায্য় করার তথ্য রয়েছে, সেগুলো সকাল থেকে ট্রান্সফার করেছে। আমি মনে করি, এটা ক্রাইম। একটা পার্টি অফিসে, এটা প্রাইভেট অর্গানাইজেশন নয়। আইপ্যাক আমাদের তৃণমূলের অথরাইজ়ড টিম। সেই টিমের কাছ থেকে সব কাগজ ছিনিয়ে নেওয়া, সব লুঠ করা, টেবিলগুলি সব ফাঁকা পড়ে রয়েছে। দলের কাগজপত্র নিয়েছে,ফোন নিয়েছে, হার্ড ডিস্ক নিয়েছে। যারা কাজ করে তাদের দিকটা তো দেখতে হবে! সব কাগজপত্র নতুন করে তৈরি করতে গেলে নির্বাচন পেরিয়ে যাবে। ভাবুন একবার।"
মমতা আরও বলেন, "আপনাদের কারও অফিসে যদি করে! আমরা রেডিস্টার্ড রাজনৈতিক দল, আয়কর দিই, আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি রয়েছে, আমাদের অডিট হয়। প্রয়োজন থাকলে আয়কর দফতর থেকে নোটিস দিতে পারত ED. নির্বাচন এলেই আয়কর দফতর নোটিস দেয়। বিজেপি-কে তো পাঠায় না! ডাকাতের ডাকাত ওরা। সবচেয়ে বড় অপরাধী, মানি পাওয়ার, মাসল পাওয়ার, কিলার অফ ডেমোক্র্যাসি। SIR -এর নামে ১.৫কোটির বেশি নাম মুছেছে।"
SIR-এর আওতায় বাংলায় সবচেয়ে বেশি মহিলা, তরুণ প্রজন্মের নাম বাদ দিচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন মমতা। সেই সময় 'জয় বাংলা', 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিন্দাবাদ' স্লোগান দেন বিজেপি-র কর্মী-সমর্থকরা। তাঁদের থামিয়ে মমতা বলেন, "লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে নাম বাদ দিয়েছে। অমিত শাহ যদি পশ্চিমবঙ্গে জিততে চান, নির্বাচনে লড়ে জিতুন। ৫৪ লক্ষ নাম বাদ দিয়েছে। বিজেপির ইশারায় কাজ করছে নির্বাচন কমিশন। আমরা এখনও চুপ করে আছি, সব সহ্য করছি। এখনও আশা করি, ন্যায় বিচার পাব। নির্বাচনের যাবতীয় রণকৌশল ছিনিয়ে নিয়ে গেছে ED. আমাদের ডেটা, আমাদের ভোট লুঠ করছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী আপনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করুন'। আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নথিপত্র নিয়ে গিয়েছে। আমাদের সঙ্গে চিটিং করলে, জুয়া খেললে মেনে নেব না।"
এর আগে প্রতীকের বাড়ি থেকে বেরনোর সময় অমিত শাহকে 'নোংরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী' বলে আক্রমণ করেছিলেন মমতা। সল্টলেকের অফিস থেকে বেরিয়ে বলেন, "অমিত শাহ বাংলায় জিততে চাইলে, নির্বাচনে লড়াই করুন। আমাদের দলের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে হানা দিয়ে ডেটা হাতিয়ে নেবেন কেন? বিশ্বাসযোগ্যতাহীন অ্যাপের মাধ্যমে কেন নাম বাদ দেবেন? BLO-রা সন্তুষ্ট হয়ে যে নাম বাদ দেয়, তা থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বিজেপি-র ইশারায় হোয়াটসঅ্যাপে কাজ করছে। লিখিত নির্দেশ নেই। কত BLO মারা গিয়েছেন। ক্ষমতা থাকেল সামনাসামনি লড়াই করো। ভোটারের নাম বাদ দিয়ে, ডেটা চুরি করে, অত্যাচার করে টিকে থাকলে ভাবলে জেনে রেখো, বাংলা দেশের গেটওয়ে। বাংলা ঠিক না থাকলে কিছুই ঠিক থাকবে না। ওরা এসব বোঝে না। নৃশংসতার নামে নিজের ধর্ম তৈরি করেছে ওরা। নিজের ছাড়া কারও কথা ভাবে না। আমি মনে করি বিজেপি একটা বিপজ্জনক দল। দেশটাকে শেষ করে দেবে ওরা।"
বিজেপি-র অফিস, তাদের তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় হানা দিলে কী ঠিক হবে, এই প্রশ্নও তোলেন মমতা। তিনি বলেন, "এখনও চুপ আছি। এখনও সহ্য করছি আমরা। এত মানুষের প্রাণ চলে গিয়েছে। এখনও আশা রাখি, ব্যায় বিচার পাব। আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি দফতরে এসে ডেটা, দলের ডেটা, প্রার্থিতালিকা, SIR কাজের তালিকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতীকের বাড়িতেও করেছে, আমাদের আইপ্যাক অফিসেও করেছে। এটা করা যায় না। ওরা তৃণমূলের দ্বারা স্বীকৃত। আমাদের নামে কাজ করে, চুক্তি হয়েছে। প্রত্যেক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাই কারও না কারও হয়ে কাজ করছে। তার মানে কি যখন তখন হামলা করতে পারে, যা ইচ্ছে তথ্য নিতে পারে? এটা কি অপরাধ নয়? গণতন্ত্র, কাজ করার অধিকারের হত্যা নয় কি? আমাদের কাগজপত্র কিছু নেই। সব সামলানোর জন্য অপেক্ষা করব আমরা, যত ক্ষণ না প্রতীক আসছেন।" ED-র ফরেন্সিক টিমের বিরুদ্ধে এফআইআর করার কথাও জানিয়েছেন মমতা। এদিন সমস্ত ব্লকে প্রতিবাদের ডাকও দেন তিনি। জানান, তৃণমূলকে আক্রমণ করেছে বিজেপি। তাদের চুরি, ডাকাতি ও লুঠের বিরুদ্ধে নামতে আহ্বান জানান।