বিশ্বজিৎ দাস, খড়্গপুর: মানুষ গড়ার কারিগর তাঁরা। সমাজগঠনে রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। নিষ্ঠাভরে সেই দায়িত্ব কী ভাবে পালন করতে হয়, হাতে ধরে শেখাতে পারে কুচলাচাটি প্রাথমিক বিদ্য়ালয়। প্রত্যন্ত গ্রামে, হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে স্কুলটি, যার নেপথ্য কারিগর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা তনুশ্রী দাস। এবার পরিশ্রমের জন্য যোগ্য স্বীকৃতি পেতে চলেছেন তিনি। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে ‘জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার’ নিতে চলেছেন তিনি। তাঁর হাতে পদক ও নগদ তুলে দেবেন রাষ্ট্রপতি। (Paschim Medinipur)

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার খড়্গপুর ১ নং ব্লকে অবস্থিত কুচলাচাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বাইরে থেকে আর পাঁচটা স্কুলের মতোই দেখতে বাইরে থেকে। কিন্তু অন্দরমহল দেখে মনেই হবে না গ্রামের স্কুল বলে। আর সেখানেই সাফল্য তনুশ্রীদেবীর। তিল তিল করে স্কুলটিকে গড়ে তুলেছেন তিনি। শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ে বেঁধে রাখেননি ছাত্রছাত্রীদের। বরং হাতেকলমে যুগপোযোগী করে তুলছেন সকলকে। এই স্কুলে পড়ুয়াদের নিজস্ব ব্যাঙ্ক রয়েছে, রয়েছে চিকিৎসাকেন্দ্র, অডিটোরিয়ামও। সবচেয়ে নজর কাড়ে স্মার্ট ক্লাসরুম। (National Teachers' Awards 2025)

ছাত্রছাত্রীরা এখানে নিজেরাই শিক্ষার উপকরণ তৈরি করে নেন। এতে হাতেকলমে কারিগরি শিক্ষা যেমন হয়ে যায়, স্কুলের পঠনপাঠনের কাজে লাগে, আবার সৃজনশীলতাও বাড়ে। এর প্রমাণও মিলেছে। কয়েক মাস আগেই সৃজনশীলতার জন্য ‘সংগ্র শিক্ষা মিশন’ আয়োজিত প্রতিযোগিতায় জেলার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে এই স্কুল। 

একদিনে নয়, তিল তিল করে স্কুলটিকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছেন তনুশ্রীদেবী। এতদিনে পরিশ্রমের যোগ্য স্বীকৃতি পেতে চলেছেন তিনি। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর, শিক্ষক দিবসে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে ‘জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার’ পেতে চলেছেন তিনি। এর আগে, ২০২০ সালে রাজ্য সরকারের কাছ থেকে ‘শিক্ষারত্ন পুরস্কার’ও পান। ২০২৩ সালে ভূষিত হন ‘নির্মল বিদ্যালয় পুরস্কার’। ১৯৯৯ সাল থেকে শিক্ষকতা করলেও ২০১৬ সালে কুচলাচাটি স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেন।

কিন্তু বাঁধাধরা নিয়মের বাইরে গিয়ে এই অসাধ্যসাধন করলেন কী করে? স্কুলে রাখা কাচের আলমারির দেখান তনুশ্রীদেবী। জানালেন, আলমারিতে রাখা ভাঁড়ে প্রতিদিন ১, ২, ৫ টাকা করে জমা দেয় ছাত্রছাত্রীরা, যার নাম রাখা হয়েছে ‘চিলড্রেন্স ব্যাঙ্ক’। আছে শুশ্রূষা কক্ষও, যেখান কোনও পড়ুয়া অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রাথমিক চিকিৎসা হয়। স্কুলে অন্য সহকর্মীদের কাছ থেকেও এব্য়াপারে সহযোগিতা পেয়েছেন তনুশ্রীদেবী। তাঁর কথায়, “প্রথম যখন এই স্কুলে আসি, গ্রামে পড়াশোনার পরিবেশ ছিল না। প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের নিয়ে পথ চলা শুরু করি আমি। অভিভাবকরা আর্থিক ভাবে দুর্বল হলেও, তাঁদের সহযোগিতা পেয়েছি। আমার স্বপ্ন ও পরিকল্পনা যে বাস্তবায়িত হয়েছে, তাতে সকলের যোগদান রয়েছে।”

রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার পাবেন জেনে আনন্দিত তনুশ্রীদেবী। তাঁর বক্তব্য, “আমার মনে হয়, শিশুদের সার্বিক বিকাশ প্রয়োজন। শুধুমাত্র বইপড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে খেলার ছলে শেখাতে হবে। স্বল্পমূল্যে টিচিং-লার্নিং মেটেরিয়াল তৈরি করেছি আমরা। আমার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবরাও জিনিসপত্র দিয়ে সাহায্য় করেছেন। আমার স্কুলের এক একটি দেওয়ালই বইয়ের পাতা হয়ে উঠেছে। প্রত্যেকটি ঘর এক-একটি বিষয়ভিত্তিক। অডিও ভিজ্যুয়াল মাধ্যমও কাজে লেগেছে।” তনুশ্রীদেবী জানিয়েছেন, পড়ুয়াদের কীভাবে পড়ানো হবে, তার প্রস্তুতি নিজেরাও নেন তাঁরা। ডায়েরিতে সবকিছু লিপিবদ্ধ করে রাখেন। দাগ দিয়ে রাখেন ক্যালেন্ডারে। বাড়িতে পড়াশোনার পরিবেশ না থাকলেও, স্কুলেই যাতে তৈরি হয়ে যায় পড়ুয়ারা, সেদিকেই নজর তাঁদের।

তবে ‘জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার’ই সব নয় বলে মত তনুশ্রীদেবীর। তাঁর কথায়, “পুরস্কার পেয়েছি বলে সব কাজ শেষ হয়ে গেল, তা নয়। এখনও পথ চলা বাকি। বরং দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল।” স্কুলের অভিভাবকরাও তনুশ্রীর এই স্বীকৃতি পাওয়াতে আনন্দিত। এক পড়ুয়ার মা তবস্সুম বিবি জানিয়েছেন, স্কুলে পড়াশোনার ধরনইটাই আলাদা। অন্য সব স্কুলের থেকে আলাদা পরিবেশ। তাঁরাও সবরকম ভাবে সহযোগিতা জোগানোর চেষ্টা করেন।


Education Loan Information:

Calculate Education Loan EMI