কলকাতা: নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশে নিয়োগের সময়সীমা বৃদ্ধি করল সুপ্রিম কোর্ট। ফলে আদালতের নির্দেশে ৩১ ডিসেম্বরের পরও সবেতন চাকরি করে যাওয়ার সুযোগ পেলেন 'যোগ্য' শিক্ষকরা। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২০২৬ সালের ৩১ অগাস্ট পর্যন্ত চাকরিতে সবেতন বহাল থাকবেন তাঁরা। নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশের নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে বাড়তি সময় পেল রাজ্যও। কিন্তু এই স্বস্তি সাময়িক, যোগ্যদের চাকরির স্থায়ীত্ব কোথায়, প্রশ্ন তুলছেন চাকরিহারা শিক্ষকদের একাংশ। (SSC Case)
বৃহস্পতিবার নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশে শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগের সময়বৃদ্ধি করেছে আদালত। আর তার পরই এবিপি আনন্দে ক্ষোভ উগরে দেন চাকরিহারা 'যোগ্য' শিক্ষক সুমন বিশ্বাস। তিনি বলেন, "এটা সাময়িক বন্দোবস্ত, যা হওয়ারই ছিল। আমরা স্থায়ী সমাধান চাইছি। ২০১৬ প্যানেলে যেখানে অযোগ্যরা চিহ্নিত, সেখানে যোগ্যদের কেন ফেরাচ্ছে না রাজ্য? কেন আদালতে তালিকা দিচ্ছে না? পরীক্ষা যখন হয়, সেই সময় সময়ই বাড়তি সময় চেয়েছিলাম আমরা। তখন বলা হল সময় নেই, এখন আবার সময়সীমা বৃদ্ধি চাইছে। সুপ্রিম কোর্ট সুযোগ দিয়েছে আবারও। রাজ্য এবার নিষ্কলঙ্কদের চাকরি ফেরাক রাজ্য। আর আদালতও বার বার অবস্থান বদল করছে। কখনও বলছে, 'একসঙ্গে পরীক্ষা নিতে বলছি না, কখনও আবার বলছে ৩১ ডিসেম্বর নয়'। এখনও সুযোগ আছে। যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের তালিকা দিলেই চাকরি বেঁচে যাবে।" (SSC Recruitment)
সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেন সুমন। তাঁর কথায়, "মুখ্যমন্ত্রী অযোগ্যদের বাঁচাতে চাইছেন। চাইছেন, যোগ্যরা রসাতলে যান, অনাহারে মরে যান। ১৮০৬ জন অযোগ্য শিক্ষককে জনগণের করের টাকায় বেতন দেওয়া হয়েছে। আমি বিচারপতিদের বলব, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ব্য়বস্থা নিন। জনগণের করের টাকা খরচ করে উনি বেতন দিয়েছেন অযোগ্যদের। কেন চাকরি চুরির দায় নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করা হবে না? সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, বোর্ড, এসএসসি, রাজ্য চাকরি চুরি করেছে। তিনটি সংস্থার মাথায় কে? মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই চাকরি চুরির দায় কার? কেন শুক্লা বিশ্বাসদের এখানে বসে থাকতে হচ্ছে? মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীকে এর জবাব দিতে হবে।"
সময়সীমা যে বাড়বে, আগে থেকেই তাঁরা জানতেন বলে দাবি সুমনের। তাঁর বক্তব্য, "এর মধ্যেও রাজনীতি আছে। ৩ এপ্রিল নতুন করে নিয়োগের কথা বলা হল। ২০১৬-র প্যানেলে শূন্য পদে নিয়োগ। সময়ের মধ্যে করতে পারল না। অযোগ্যদের বাঁচাতে, নিজেদের গদি বাঁচাতে এতকিছু।"
আর এক চাকরিহারা 'যোগ্য' শিক্ষক চিন্ময় মণ্ডল বলেন, "এটা কাম্যই ছিল। কারণ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে কতটা সময় লাগতে পারে, এটা যাঁরা করেন, যাঁরা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যান, তাঁরা জানেন। তিন-চার মাসে গোটা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়া কখনওই শেষ হওয়ার নয়। এত মামলা রয়েছে, প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ইস্যুতে মামলা হচ্ছে। এত তাড়াতাড়ি সম্ভব নয়। তাই ৩১ অগাস্ট পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। যোগ্যরা চাকরিরত থাকবেন, নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলবে। আশাকরি, তাড়াতাড়ি প্রক্রিয়া মিটুক। এবার আবার নতুন কিছু প্রক্রিয়াও যুক্তি হয়েছে, যেমন পিভিআর এবং মেডিক্যাল টেস্ট নিয়োগের আগেই হবে। তাই সময় বেশি লাগবেই।"
তবে আট মাসের সময়সীমাবৃদ্ধি সাময়িক স্বস্তি বলে মানছেন চিন্ময়ও। তাঁর কথায়, "এগুলো সাময়িক স্বস্তি। আমরা এসব চাই না। চাকরির স্থায়ীত্ব চাই। একটা সাময়িক স্বস্তি অবশ্যই মিলেছে। মাথার মধ্যে চিন্তা ঘুরছিল যে, আর কিছু দিন বাকি। তার পর হয়ত জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে। তাতে কিছুটা সময় পাওয়া গেল। আমরা চাই চাকরি যেন স্থায়ী হয়। যারা ভেরিফিকেশনে ডাক পেল না, এত দুশ্চিন্তার মধ্যে নতুন করে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারল না, তাদের মানসিক অবস্থা শোচনীয়। আমরা চাই সব যোগ্য যেন চাকরিতে বহাল থাকেন। চাকরি যেন স্থায়ী হয়।"
আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, পদ্ধতিগত কারণেই সময়বৃদ্ধির আবেদন জানানো হয়েছিল। মেডিক্যাল চেকআপ, পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টের ব্যাপার রয়েছে। তাই সময় বাড়িয়েছে আদালত। তাঁদের তরফে মেয়াদবৃদ্ধিতে আপত্তি জানানো না হলেও, এত বেশি সময় দেওয়াও আপত্তি তলা হয়েছিল বলে জানান বিকাশরঞ্জন।
আদালত নিয়োগ প্রক্রিয়ার মেয়াদ বৃদ্ধি করায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নতুন চাকরিপ্রার্থীরাও। চাকরিহারাদের ১০ নম্বর বাড়তি দেওয়ার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, "চাল থেকে কাঁকর আলাদা করাই যায়নি। যাদের যোগ্য বলছে, তাদের নিয়েই যত ভাবনা। ইন্টারভিউ হোক সাদা কাগজ জমা গিয়ে, চাকরি পেয়েছে। তৃণমূলের সব নেতা দুর্নীতিতে যুক্ত। সময়সীমা না বাড়ালে ভোটের আগে পাবলিক, চোর মাস্টারমশাইরা কলার ধরে কুকুরের মতো মারবে। তাতে কী হবে? তৃণমূল, কমিশন এবং শিক্ষামন্ত্রীর গায়ে দাগ লাগবে। ভোটের বৈতরণী পেরোতে পারবে না। কোনও রকমে মাঠ বাঁচিয়ে, ভোটের বৈতরণী পেরোতেই গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে এবং বার বার মেয়াদ বাড়াচ্ছে।" সময়সীমা বৃদ্ধিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ করা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা যাবে বলেও মত নতুন চাকরিপ্রার্থীদের।