শিবাশিস মৌলিক, সনৎ ঝা ও কৃষ্ণেন্দু অধিকারী : "চোপড়ার কুখ্য়াত গুন্ডা মাফিয়া বিধায়ক তাঁর বিরুদ্ধে যত মামলা আছে, রি-ওপেন করবেন।" ঋতব্রত-শিবির ছাড়ার ইঙ্গিত মিলতেই হামিদুল রহমানকে হুঁশিয়ারি দিলেন মুখ্য়মন্ত্রী। বিধানসভায় শোভনদেব চট্টোপাধ্য়ায়ের মিষ্টি খাওয়ার পরই নিরাপত্তা তুলে নেওয়া হল কাজল শেখের। কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দুই বিধায়কই। তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা। 

Continues below advertisement

ঋতব্রত-শিবিরের বিধায়কদের একাংশ সুর বদলাতে শুরু করলেই, কি বদলে যাচ্ছে সমীকরণ ? কোনও বিধায়ক ওই শিবির ছেড়ে মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ের দিকে ফিরতে চাইলেই, কি তাঁর ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে ?

বিধানসভা ভোটে ভরাডুবির পর ভেঙে দু'ভাগ হয়েছে তৃণমূল। তৃণমূলের প্রতীকে জেতা একাধিক বিধায়ক বিদ্রোহ করে চলে গেছেন ঋতব্রত-শিবিরে। যা এখন গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস। সেই তালিকায় ছিলেন চোপড়ার বিধায়ক হামিদুল রহমানও। কিন্তু, বুধবার তিনি সুর বদলে মমতা-তৃণমূলের দিকে ঝোঁকার ইঙ্গিত দেন। তাঁকে বলতে শোনা গেছে, "আমরা কালীঘাট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল করি। ওঁর (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) প্রতীকেই জিতেছি। দলের হাইকমান্ড উনিই (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) । কারণ, ঋতব্রতকে (ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়) সই করেছিলাম ও (ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়) সেইদিন বলেনি যে ও (ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়) আলাদা দল করবে।"  

Continues below advertisement

এরপর বৃহস্পতিবার রায়গঞ্জে গিয়ে চোপড়ার বিধায়ককে হুঁশিয়ারি দিলেন মুখ্য়মন্ত্রী। তিনি বলেন, "চোপড়া, ইসলামপুর, গোয়ালপুকুর, চাকুলিয়া সহ চা বাগানে যত জমি জোর করে বেদখল করেছে, সব উদ্ধার করতে হবে। আমি SP ইসলামপুর, DIG AIG কে বলে গেলাম, চোপড়ার কুখ্য়াত গুন্ডা মাফিয়া বিধায়ক তাঁর বিরুদ্ধে যত মামলা আছে, পুনরায় (রিওপেন) খুলুন এবং যত জমি লুঠ করেছে এরা সব জমি উদ্ধার করবেন। সব গুলোকে ওই চোর ইন্দ্রনীল সেনের মতো জেলে ঢোকানোর কাজ করব।"

পাল্টা হামিদুল রহমান বলেছেন, "যদি মামলা থাকে, তাহলে ওপেন করবে। আইনি ব্যবস্থা, আইনের তো বাইরে কেউ না। যদি মামলা থেকে থাকে তাহলে ওপেন করবে। আমি বললে তো আর হবে না বা মুখ্যমন্ত্রী বললেও হবে না। মামলা থাকলে ওপেন করবে।"

ঋতব্রত-শিবির অর্থাৎ গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসে যাওয়া আরেক বিধায়ক কাজল শেখের অবস্থান নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছে। বুধবারই বিধানসভায় মমতা-তৃণমূলের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্য়ায়ের দেওয়া মিষ্টি খান কাজল শেখ। শোভনদেব বলেন, "আজকে বিজয়ার মিষ্টি খাওয়াব, চল... বলে ঢুকিয়ে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিয়েছি। দিয়ে, মিষ্টি দিয়েছি। কাজল শেখের সঙ্গে আমার অত্য়ন্ত, ভীষণ ভাল সম্পর্ক। আজকের নয়। বহু অনুষ্ঠানে আমার বাড়িতে ফল... ইত্য়াদি পাঠায়।" 

প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি ঋতব্রত বন্দ্য়োপাধ্য়ায়দের শিবির ছেড়ে মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ের দিকে ফিরতে পারেন কাজল শেখ? এরপর বৃহস্পতিবারই কাজল শেখের দেহরক্ষী প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় নবান্নের তরফে। কাজল শেখ বলেন, "কালকে মিষ্টি খাওয়ার জের কিনা আমি বলতে পারব না, যদি মিষ্টি খাওয়ার জের হয়ে থাকে। বাঙালির সব থেকে বড় উৎসব হচ্ছে দুর্গোৎসব, দুর্গাপুজো। দুর্গাপুজোতে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌজন্য বিনিময় হয়। তাছাড়া একজন সিনিয়র লিডার। সে যদি আমাকে ডাকে, মিষ্টি খাওয়ায়। যদি খেয়েছি, এটা কি অপরাধ? যদি অপরাধ হয়ে থাকে, আমি যেন এই অপরাধে বার বার অপরাধী হই।" 

সন্ধেয় কাজল শেখের ২ ভাইপোর বাড়িতে পৌঁছে যায় পুলিশ। চলে তল্লাশি। পুলিশের দাবি, এক ভাইপোর বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় একটি সেভেন এমএম পিস্তল এবং ৭ রাউন্ড গুলি। এ প্রসঙ্গে মমতা তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, "তিনি (হামিদুল রহমান) প্রকাশ্য়ে বলেছেন, তিনি মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ের সঙ্গে আছেন। তারপরই আজকে বলা হচ্ছে, তার সমস্ত কেস ওপেন করে দেওয়া হচ্ছে। এর মানে কী ? তাহলে চাটনের বিরুদ্ধে কেন কেসটা খোলা হবে না? মিষ্টি খাইয়েছে বলে তার (কাজল শেখ) নিরাপত্তা তুলে নেওয়া হবে ! কোন ধরনের রাজত্ব চলছে?" 

গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক আখরুজ্জামান বলেন, "যদি কেউ মাফিয়া হয়, তার বিরুদ্ধে যদি দুর্নীতি বা মাফিয়াগিরির অভিযোগ থাকে, সরকার পদক্ষেপ নিতেই পারে, এটা বলার কী আছে, এটা হুমকি দেওয়ার কী আছে ? আমি মনে করি, বিধায়কের নিরাপত্তা থাকা প্রয়োজন আছে। এবং আমি ওঁকে বলব যে, উনি স্পিকারের কাছে একটা প্রপারলি অ্যাপ্লাই করুন।  আমি নিশ্চয়ই ওঁর সঙ্গে সহমত হব।" সব মিলিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।