কলকাতা: একদিকে স্বামীকে হারানোর যন্ত্রণা, অন্যদিকে সামাজিক কটাক্ষ। তার পরেও থেমে থাকেননি রাজস্থানের আজমেরের রোহিণী গুর্জর। জীবনের একের পর এক কঠিন আঘাত তাঁকে বারবার ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রতিবারই নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। প্রায় ১৫ বছর পড়াশোনা থেকে দূরে থাকার পর ফের হাতে তুলে নিয়েছিলেন বই। লক্ষ্য ছিল সরকারি চাকরির পরীক্ষা।
সেই লড়াইয়ের ফলও মিলেছে। রাজস্থান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের RAS Recruitment 2024 পরীক্ষায় সফল হয়েছেন রোহিণী। MBC বিধবা শ্রেণিতে রাজ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে রাজস্থান অ্যাকাউন্টস সার্ভিসের অফিসার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেই তাঁর সাফল্যের খবর সামনে আসে।
গ্রামের প্রথম স্নাতক মেয়েদের একজন
আজ যে রোহিণী সরকারি আধিকারিক, তাঁর পথচলা কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না। আজমেরের ঘুঘরা গ্রামের বাসিন্দা রোহিণী ২০০৬ সালে BA পাশ করেন। তাঁর গ্রামে সেই সময় মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ খুব বেশি ছিল না। ফলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেই নজির তৈরি করেছিলেন তিনি।
বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন রোহিণী। সেই সূত্রেই পড়াশোনার পরিবেশ পেয়েছিলেন তিনি। কলেজের পড়া শেষ করার পর একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতাও শুরু করেন। কিন্তু এরপরই জীবনের গতিপথ বদলে যায়।
বিয়ের পর সংসার, থেমে যায় পড়াশোনা
২০১১ সালে ২২ বছর বয়সে বিয়ে হয় রোহিণীর। বিয়ের পর সংসার ও পরিবারের দায়িত্বই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান কাজ। দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার চলছিল। নিজের পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবার সুযোগও ক্রমশ কমে যায়।
এর মধ্যেই আসে বড় ধাক্কা। স্বামীর মৃত্যুর পর একা হয়ে পড়েন রোহিণী। দুই মেয়েকে নিয়ে কীভাবে জীবন কাটাবেন, তা নিয়েও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। তার উপর শ্বশুরবাড়ির তরফে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগও ছিল। এমনকী স্বামীর মৃত্যুর জন্য তাঁকেই দায়ী করে নানা কটাক্ষ শুনতে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন রোহিণী।
এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন তিনি। প্রায় ছ'মাস ধরে নিজেকে সামলে ওঠার চেষ্টা করেন। সেই কঠিন সময়ে তাঁর ভাই নরেন্দ্র গুর্জর এবং শাশুড়ি পুষ্পা দেবী পাশে দাঁড়ান।
১৫ বছর পর ফের হাতে বই
জীবন থমকে গেলেও শেষ পর্যন্ত হার মানেননি রোহিণী। স্বামীর মৃত্যুর কয়েক মাস পর ফের পড়াশোনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। প্রায় ১৫ বছর পর আবার শুরু হয় তাঁর পড়াশোনা। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা সম্পর্কে তখন তাঁর তেমন ধারণা ছিল না। কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়, কোন বিষয় পড়তে হয়—অনেক কিছুই ছিল অজানা। তবুও শুরু করেন RAS পরীক্ষার প্রস্তুতি। প্রথমবার পরীক্ষায় প্রিলিমিনারি পেরিয়ে গেলেও মেইন পরীক্ষায় মাত্র ১০ নম্বরের জন্য পিছিয়ে পড়েন। কিন্তু সেই ব্যর্থতাকে শেষ বলে মেনে নেননি। ফের প্রস্তুতি শুরু করেন এবং পরবর্তী পরীক্ষায় আরও দৃঢ় লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যান।
ফের এল ব্যক্তিগত জীবনের ভয়াবহ আঘাত
পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও একের পর এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে রোহিণীকে। তাঁর সবচেয়ে বড় সমর্থকদের একজন ছিলেন শাশুড়ি পুষ্পা দেবী। কিন্তু পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যেই তাঁরও মৃত্যু হয়। এই শোক কাটিয়ে ফের পড়ায় মন দেন রোহিণী। কিন্তু তার পরেই আসে আরও ভয়াবহ আঘাত। পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে তাঁর ১০ বছরের মেয়ে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও মেয়েকে বাঁচানো যায়নি। মায়ের কোলে মেয়ের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় কার্যত ভেঙে পড়েছিলেন রোহিণী। পরীক্ষায় বসার কথা ভাবতেও পারছিলেন না তিনি।
মেয়ের মুখই ফের শক্তি জুগিয়েছিল
মেয়েকে হারানোর পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা তাঁর কাছে অসম্ভব মনে হচ্ছিল। যে পরীক্ষার জন্য এতদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়েছেন, সেটিও ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর ছোট মেয়ের মুখ তাঁকে আবার সাহস দেয়। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ফের নিজেকে শক্ত করেন রোহিণী। সিদ্ধান্ত নেন, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও পরীক্ষা দেবেন। এরপরও তাঁর পরীক্ষা দেওয়া সহজ ছিল না। পরীক্ষা দেওয়ার আগে একটি পথ দুর্ঘটনায় আহত হন তিনি। মুখ ও চোখে চোট লাগে এবং কয়েকদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। চিকিৎসার পর বাড়ি ফেরার পর পরিবারের সদস্যরা তাঁকে পরীক্ষায় বসার জন্য উৎসাহ দেন। শেষ পর্যন্ত সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছন রোহিণী।
শেষ পর্যন্ত এল সাফল্য
দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে আসে সেই দিন। RAS Recruitment 2024-এ সফল হন রোহিণী গুর্জর। MBC বিধবা ক্যাটেগরিতে রাজ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন তিনি এবং Rajasthan Accounts Service Officer হিসেবে নির্বাচিত হন। এক সময় যাঁর পড়াশোনা থেমে গিয়েছিল, যাঁকে স্বামীর মৃত্যুর পর সামাজিক কটাক্ষ সহ্য করতে হয়েছিল, যিনি নিজের মেয়েকেও হারিয়েছেন—সেই রোহিণীই শেষ পর্যন্ত সরকারি আধিকারিক হয়ে দেখালেন, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, ইচ্ছাশক্তি থাকলে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।
রোহিণীর গল্প তাই শুধু একটি সরকারি চাকরি পাওয়ার কাহিনি নয়। এটি একজন মায়ের, একজন বিধবার এবং একজন নারীর নিজের পরিচয় নতুন করে তৈরি করার লড়াই। তাঁর সাফল্য প্রমাণ করে, জীবনের কোনও পর্যায়েই নতুন করে শুরু করার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না।
Education Loan Information:
Calculate Education Loan EMI