কলকাতা: মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বুঝে গিয়েছিল, আগামীর পথটা আর পাঁচজনের মতো সহজ নয়। তারপর কত লড়াই । যন্ত্রনাদায়ক চিকিৎসা বহু মাস। এরপরও এ বার। উচ্চ মাধ্যমিকের চূড়ান্ত ফলে মেধা তালিকায় জায়গা করে নিল অদ্রিজা । ৪৮৭ নম্বর পেয়ে যৌথভাবে দশম স্থান অর্জন করেছে। রামকৃষ্ণ সারদা মিশন ভগিনী নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়ের মেয়ে সে।
ছোট্ট অদ্রিজার শরীরে ধরা পড়েছিল টি-সেল লিম্ফোমা ক্যানসার। ফুসফুসে জল জমেছিল, তৈরি হয়েছিল মাংসপিণ্ড। বই, গল্পের বই, গান আর আবৃত্তি নিয়ে থাকা মেয়েটার স্বাভাবিক জগৎ মুহূর্তে বদলে যায়।
চিকিৎসার জন্য পরিবার নিয়ে মুম্বইয়ের টাটা হাসপাতালে যেতে হয় অদ্রিজাকে। মাসের পর মাস ধরে চলতে থাকে চিকিৎসা। বাবা-মা মুখে কিছু না বললেও ছোট্ট মেয়েটা বুঝে গিয়েছিল, সে এক কঠিন লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক কেমোথেরাপি, কড়া ডোজের ওষুধ আর অনিশ্চয়তায় ভরা দিন—সবটাই খুব কাছ থেকে দেখেছে সে। মা-বাবার মন বলত, সব কবে আবার ঠিক হবে? অদ্রিজা সবটাই বুঝত।
২ বছর ৮ মাসের লড়াই, ৮২টি কেমোথেরাপি
টানা ২ বছর ৮ মাস ধরে চলে চিকিৎসা। এই দীর্ঘ সময়ে অদ্রিজাকে নিতে হয়েছে ৮২টি কেমোথেরাপি। অন্য রাজ্যে, সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে কাটাতে হয়েছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। শারীরিক যন্ত্রণা যেমন ছিল, তেমনই ছিল মানসিক চাপও। কিন্তু এত কিছুর পরেও হার মানেনি অদ্রিজা।
জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় লড়াই করার সময় যেমন পাশে ছিল পরিবার, তেমনই নিরবিচ্ছিন্নভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল তাঁর স্কুলও। চিকিৎসার ফাঁকেই পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছে সে। নিজের স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেয়নি কোনওদিন।
পড়াশোনায়ও অনবদ্য সাফল্য
রামকৃষ্ণ সারদা মিশন সিস্টার নিবেদিতা গার্লস স্কুলের ছাত্রী অদ্রিজা উচ্চ মাধ্যমিকে পড়েছে কলা বিভাগে। ভূগোল, অর্থনীতি, কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন এবং মনোবিদ্যা ছিল তাঁর পছন্দের বিষয়।
উচ্চ মাধ্যমিকের থার্ড সেমেস্টারের পরীক্ষায় সম্ভাব্য সেরা দশে নবম স্থান অধিকার করে নজর কেড়েছিল অদ্রিজা। তাঁর প্রাপ্ত নম্বর ছিল ৯৭.৩৭ শতাংশ। প্রথম পর্বের পরীক্ষাতেও মেধাতালিকায় নাম ছিল তাঁর।
এ বার উচ্চ মাধ্যমিকের চূড়ান্ত ফলে মেধাতালিকায় জায়গা করে নিল অদ্রিজা। ৪৮৭ নম্বর পেয়ে যৌথভাবে দশম স্থান অর্জন করেছে সে। এই স্থানে তাঁর সঙ্গে রয়েছে আরও ১২ জন পড়ুয়া। শতাংশের হিসেবে ফল আরও ভালো হলেও স্থানাঙ্ক সামান্য পিছিয়েছে।
জীবনযুদ্ধ জিতে নতুন স্বপ্ন
মারণরোগকে হারিয়ে শিক্ষাজীবনের এই সাফল্য শুধু একটি ফলাফল নয়, বহু মানুষের কাছে তা অনুপ্রেরণার গল্প। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সাহস আর অধ্যবসায় দিয়ে অদ্রিজা প্রমাণ করে দিয়েছে, প্রতিকূলতা যত বড়ই হোক, স্বপ্নকে থামিয়ে রাখা যায় না।
ভগিনী নিবেদিতার আদর্শে বড় হয়ে ওঠা অদ্রিজার আগামী দিনের লক্ষ্য ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি নিয়ে পড়াশোনা করা। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা আর লড়াই হয়তো একদিন অন্য কাউকে বাঁচার সাহস জোগাবে।
Education Loan Information:
Calculate Education Loan EMI