কোচবিহার: গতকাল সকালে মায়ের হাত ধরে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলেন ছেলে। আজ সেই ছেলেরই মৃতদেহ আনতে মর্গে যাচ্ছেন মা। কাঁদতে কাঁদতে শুকিয়েছে চোখের জল। এবার ছেলে চিরঞ্জিত কারজির মৃত্যুতে সিবিআই তদন্তের দাবি জানালেন মা দুলালি কারজি। অসুস্থ বাবা নীরেন কারজির দাবি, তৃণমূলের গুন্ডারাই খুন করেছে তাঁর ২৩ বছরের তরতাজা ছেলেকে। গতকাল দিনহাটার ভিলেজ ওয়ানের এনপি বিদ্যালয়ের ৭/৬২ নম্বর বুথে গুলি চলে। গুলিবিদ্ধ হন চিরঞ্জিত কারজি। তাঁর পাঁজরে গুলি লাগে। পরিবারের দাবি, দেড়ঘণ্টা ভোটকেন্দ্রেই পড়েছিলেন ওই তরুণ। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।
ভোটের দিন, সারা বাংলায় দিনভর হিংসার ছবি সামনে এসেছে। কোচবিহারের নানা জায়গা বারবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। হিংসার ঘটনা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এক সাধারণ ভোটারেরও। এক সচেতন নাগরিকের মতোই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে গিয়েছিলেন তিনি। বাবা অসুস্থ থাকায় বাড়িতেই ছিলেন। মাকে সঙ্গে নিয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানেই ঝামেলা শুরু হয়ে যাওয়ায় কোনওমতে মাকে নিয়ে একটি বাড়িতে লুকিয়ে রাখেন তিনি। তারপর ঝামেলা কমেছে কিনা দেখতে ফের ভোটকেন্দ্রে আসেন তিনি। তখনই একটি তাঁর পাঁজর এসে লাগে।
ভোট হিংসা কেড়ে নিয়েছে ছেলের প্রাণ। কোচবিহারের দিনহাটার কারজি পরিবারে শোকের ছায়া। ছেলের মৃত্যুর CBI তদন্তের দাবি করলেন সন্তানহারা মা। বুকের গভীর থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাস।
শনিবারের রক্তস্নাত পঞ্চায়েত ভোটে হিংসার শিকার হয়েছেন কোচবিহারের দিনহাটার ভোটার চিরঞ্জিত কারজি। বৃদ্ধা মায়ের ঘরে এখন শুধুই শোক আর ছেলের স্মৃতি।
ভোটের দিন সকালে, মায়ের সঙ্গে দিনহাটার কালীরপাট মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়েছিলেন বছর তেইশের চিরঞ্জিত। দাঁড়িয়ে ছিলেন ভোটের লাইনে। সেই সময়, ভোট কেন্দ্রে আক্রমণ করে দুষ্কৃতীরা। মুড়ি মুড়কির মতো বোমাবাজি হয়। চলে গুলি। প্রাণ বাঁচাতে মাকে পাশের একটি বাড়িতে নিয়ে যান তিনি।
নিহত চিরঞ্জিত কারজির মা দুলালি কারজি বলেন, 'আমায় নিয়ে একটা বাড়ির মধ্য়ে ঢুকিয়ে দিল। বাবা যাস না বলি বারবার, কিন্তু ও চলে যায়।' মাকে প্রতিবেশীর বাড়িতে ঢুকিয়ে তুমুল গোলাগুলি চলা ভোট কেন্দ্রে এলে। সেখানেই চিরঞ্জিতের বুক ফুঁড়ে ঢুকে যায় বুলেট। রক্তাক্ত অবস্থায় সেখানে ১ ঘণ্টার ওপর পড়ে ছিলেন। পরে, কোচবিহারের এমজেএন হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। দুলালি কারজি বলেন, 'গিয়ে দেখি সারা দেহ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কেউ নেয়নি।'
বাড়িতে অসুস্থ বাবা, বৃদ্ধা মা রয়েছেন। দাদা বেঙ্গালুরু পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করলেও ছোট ভাই চিরঞ্জিতের জনমজুরির আয়েই দিন গুজরান হত দিনহাটার কারজি পরিবারের। মায়ের আশা ছিল, বিয়ে দিয়ে ছেলের সংসার গুছিয়ে দেবেন। কিন্তু ভোট-সন্ত্রাস নিভিয়ে দিল সব আশার আলো। ছেলেকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছেন বাবা। বৃদ্ধা মাকেই ছুটতে হয়েছে ছেলের দেহ শনাক্ত করতে। এর থেকে মর্মান্তিক ছবি আর কী হতে পারে?