কলকাতা: ভোটের উত্তাপ অনুভূত হচ্ছে গোটা রাজ্য়েই। একদিকে, SIR নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছে যেমন, তেমনই ভোটের সম্ভাব্য ফল কী হতে পারে, তা নিয়েও চলছে বিচার বিশ্লেষণ। তবে বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হোক বা রাতারাতি আমলা-আধিকারিক বদলি, রাজ্য সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এহেন সংঘাত যে বেনজির, তা মেনে নিচ্ছেন প্রায় সকলেই। সেই নিয়ে এবার মুখ খুললেন রাজ্যের একসময়ের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক তাথা IAS অফিসার দেবাশিস সেন। পাশাপাশি, এবারের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে কোন দল এগিয়ে, কোন দল পিছিয়ে, আন্তর্জাতিক স্তরে সেই নিয়ে কী ভাবনা, তাও তুলে ধরেন। (ABP Maha Yuddha Elections 2026)
ভোটের মুখে এবিপি আনন্দের 'মহাযুদ্ধ' অনুষ্ঠানে এসে রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খোলেন দেবাশিস সেন। বক্তৃতার শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রাজর্ষি' উপন্যাসের উল্লেখ করেন তিনি। শ্বেতপাথরে বাঁধানো ঘাটে স্নান করতে গিয়ে রক্তের দাগ নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় মহারাজা গোবিন্দ মাণিক্যকে। রক্তপাত বন্ধ করতেই আজ পশ্চিমবঙ্গে বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী নামাতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। বলেন, "২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৫০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়। তার আগে, ২০০৮ সালে বামফ্রন্টের আমলেও পঞ্চায়েত নির্বাচনে অনেকে মারা যান। কিন্তু ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচন হিংসামুক্ত ছিল। এবারে দু'দফায় নির্বাচন হচ্ছে। তার জন্য ফোর্স আনা হয়েছে। ভালই হয়েছে। এটা নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকতে পারে না। দীর্ঘ সময় ধরে ভোট হলে মানুষও অধৈর্য হয়ে পড়েন, উন্নতির কাজও আটকে থাকে।" (West Bengal Elections 2026)
তবে নির্বাচন যে হারে আমলা-আধিকারিক বদলি করছে, তার সঙ্গে একমত পোষণ করেননি দেবাশিস সেন। বরং তাঁর বক্তব্য, "নির্বাচন ঘোষণা হলে চিরকালই প্রতীকী পরিবর্তন ঘটাতে হয়। নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং সরকার, দু'টি যে আলাদা, তো বোঝানোর জন্যই। একটা ঝাঁকুনি, যাতে বোঝা যায়, বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল নেই, কমিশনের কথা শুনে চলতে হবে। কিন্তু এবার কেন যেন মনে হচ্ছে, শুধু সিম্বলিজম, নট বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়ালে আটকে নেই বিষয়টি। বরং তার চেয়ে অতিরিক্ত মাত্রা পেয়ে যাচ্ছে। ইতিহাসে কখনও মুখ্যসচিবকে সরানো হয়নি। বাংলা নয় শুধু, ভারতের কোথাও এমন হয়েছে কি না, খুঁজে দেখতে হবে। কেন প্রয়োজন পড়ল, তা ভেবে দেখার জায়গা আছে। রোজই পাল্টাচ্ছে, আজও রিটার্নিং অফিসার পাল্টেছে। এটা বোধহয় শুধু প্রতীকী পদক্ষেপ নয়। এটা আসলে বিশ্বাসহীনতা। মনে করা হচ্ছে, রাজ্য যদি কাউকে দিয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই সে তার লোক, আমার পক্ষে কাজ করবে না। সুতরাং তাকে পাল্টাও। এরকম মনোবৃত্তি হচ্ছে। ১৯৩ জন সাংসদ মিলে নির্বাচন কমিশনারকে ইমপিচ করার প্রস্তাব দেওয়ার মতো ঘটনাও আগে ঘটেনি। ফলে সংঘাত যে জমে গিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।" পাশাপাশি, নয়া নিযুক্ত আধিকারিকদের যেভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে, তাঁদের কোনও দলের 'ক্যাশ ট্রান্সফার' এবং 'অস্ত্র ট্রান্সফারের' লোক বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাও সমীচীন নয় বলে মত দেবাশিস সেনের।
নির্বাচনের মুখে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন বা SIR করা নিয়ে যে বিতর্ক, সেই প্রসঙ্গে, দেবাশিস সেন বলেন, "ভোটার তালিকার স্বাস্থ্য পরীক্ষা বরাবরই হয়ে আসছে। নারী-পুরুষের হার কতটা বদলাচ্ছে, তারও রুটিন চেক হতো। বড়বাজারে একসময় দো গিয়েছিল মহিলার চেয়ে পুরুষের সংখ্যা বেশি। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেল, বেশিরভাগই ভিন্ রাজ্যের শ্রমিক, উত্তরপ্রদেশ-বিহারে পরিবার-পরিজনরা রয়েছেন। তাঁরা একা থাকেন কর্মসূত্রে। কিন্তু সেই সবই গিয়ে দেখতে হতো। এখন হচ্ছে লোককে ডেকে পাঠানো। এটা না করলেই বোধ হয় ভাল হতো। চিরকালই ভোটার তালিকার স্বাস্থ্য় পরীক্ষা হতো। তখন AI ছিল না। ফলে বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে ব্যবধান, ছেলেমেয়ের সংখ্য়া মেলানোর উপায় ছিল না। কিন্তু এই যে বিভ্রান্তি, তা মানুষকে ভোগাচ্ছে। মনে হয় AI-কে ভাল ভাবে ট্রেনিং দেওয়া হয়নি। নইলে মুখার্জি-মুখোপাধ্যায়ের ফারাক সহজেই বোঝানো যায়। বাচ্চা ছেলেও বলেও দেবে।"
কিন্তু দেদার আমলা-আধিকারিক বদলি, বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী, পুলিশ মোতায়েন করলেও ভোটের ফলে তেমন কোনও প্রভাব ফেলা সম্ভব নয় বলে মত দেবাশিস সেনের। তাঁর কথায়, "এই যে যুদ্ধ হচ্ছে, তার প্রভাব কতটা, তাও বোঝা যায়। আমি কৌতূহলবশত আন্তর্জাতিক বেটিং সাইট কী বলছে দেখলাম। ফলাফল আর বলছি না। কিন্তু কত অডস উঠে আসছে। আঁচ পেলাম যে, ডিসেম্বর-জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি, ট্রেন্ড বদলাচ্ছে। দলের নাম করে বলছে। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী যেমন বলেছিলেন, রাজনীতিতে একসপ্তাহও বিরাট সময়। শেষ পর্যন্ত কী হবে কেউ জানে না। আধিকারিক, কী পুলিশ, কোনওটাি ফল পাল্টায় বলে মনে হয় না। ২০০৬ সালে যখন আধা সামরিক বাহিনী এল, সব উল্টে যাবে বেভেছিলেন প্রচুর মানুষ। কিছু হয়নি। বামেদের ২৩৫ হয়েছিল। মন থেকে বলছি, এই ট্রান্সফার, বাহিনী, এতে কিন্তু ফলাফলে কোনও প্রভাব পড়ে না।"
নির্বাচনী মরশুমে কেন্দ্রীয় বাহিনী থেকে SIR, কমিশনের সঙ্গে রাজ্যের সংঘাত, সব কিছু নিয়ে আলোচনা হলেও, গ্রামীণ ভোট, সংখ্যালঘু ভোট, সরাসরি হাতে হাতে সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলি নিয়ে সেভাবে আলোচনা হচ্ছে না বলে মত দেবাশিস সেনের। তিনি আবার গোটাটাই সাজানো হতে পারে বলে সন্দেহ করছেন। অন্য সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতে এই পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
প্রাক্তন IAS অফিসার দেবাশিস সেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক ছিলেন। তাঁর আমলেই যুগান্তকারী প্রতীক পেয়েছিল নির্বাচন কমিশন, 'আনন্দবাবু'। কাল্পনিক সেই চরিত্র নির্বাচন সংক্রান্ত সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিত। বর্তমানে যদিও আতঙ্ক এবং আশঙ্কা জাঁকিয়ে বসেছে।
