কলকাতা: ইঁদুরদৌড়ের যুগ। মানুষ যেন নিজেকে প্রমাণ করতে করতে বাঁচতেই ভুলে গিয়েছেন। অন্তত এমনটাই অনুভব করছেন অভিনেতা পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায় (Tathagata Mukherjee)।আর সেই কারণেই তিনি পর্দায় তুলে ধরতে চেয়েছেন বাঙালির এমন এক গল্প, যেখানে মানুষ বাঁচতে ভুলে যায়নি। আনন্দ করতে ভুলে যায়নি। যেখানে প্রমাণ করার কোনও তাগিদ নেই, যেখানে বাঁচা মানে উদযাপন... সেই গল্পই বলবে তথাগতর পরিচালিত নতুন ছবি 'রাস'। মুখ্যভূমিকায় বিক্রম চট্টোপাধ্যায় (Bikram Chatterjee) ও দেবলীনা কুমার (Devlina Kumar)।
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে 'রাস' যেন একটা হারিয়ে যাওয়া বাঙালি পরিবারের গল্প বলছে। তথাগত কেন মনে করেছিলেন এই নস্ট্যালজিয়াটাকে ফিরিয়ে আনা জরুরি? পরিচালক বলছেন, 'শুধু নস্ট্যালজিয়া ফিরিয়ে আনব বলে আমি ছবিটা বানাইনি। বেঁচে থাকা যে প্রতিযোগিতা নয়, একটা উদযাপন.. এই বার্তা দিতেই ছবিটা তৈরি করা। আর সেই গল্পটা বলতে আমি এমন একটা সময়কে সিনেমার পর্দায় তুলে ধরতে চেয়েছি, যে সময়ে অঙ্কের মাস্টার পড়ানোর পরে ক্যারাম খেলতে বসে পড়তেন। বাড়ির দিদিরা গোঁফ লাগিয়ে অভিনয় করতেন। কিন্তু এই সবের মধ্যে কোনও সেরা হওয়ার দৌড় ছিল না। নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদ ছিল না যে আমিই সবার থেকে সেরা।' ব্যক্তিগত জীবনেও কি তথাগত এই প্রতিযোগিতা দেখতে পান? হাসতে হাসতে পরিচালক বললেন, 'সবাই.. সবাই। আমার তো মনে হয়, আমার আশেপাশে সবার ভিতরে প্রমাণ করার তাগিদটা ভীষণ বেড়ে গিয়েছে। সবাই মনে করেন, আমিই শ্রেষ্ঠ। আমি নিজেকে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার হওয়া থেকে অনেক দূরে রাখি। আমার কাছে সিনেমা মানে উদযাপন। সেই কারণেই আমি সিনেমা বানাই।'
সিনেমা বানানোর সময়ে ব্যবসায়ীক দিক কি মাথায় রাখেন তথাগত? অভিনেতা বলছেন, 'দুটোই। আমায় ব্যবসা আর আবেগ দুইই মাথায় রাখতে হয়। আবেগটা দর্শকদের কমার্শিয়ালি দেখাতে হবে। নাহলে দর্শক বিনোদন পাবেন না।' এই ছবির দুই মুখ্য চরিত্র বিক্রম আর দেবলীনা, তাঁদের কেন বেছেছিলেন তথাগত? পরিচালক বলছেন, 'বিক্রমের সঙ্গে আমি আগেও কাজ করেছি 'পারিয়া'-তে। সেখানে ওর চরিত্রটা একেবারে অন্যরকম ছিল। তবে বিক্রমের মধ্যে একটা ভীষণ ছেলেমানুষি রয়েছে। দাড়ি গোঁফ কামিয়ে ওকে এই লুকে খুব একটা দেখা যায় না। বিক্রম একটু লাজুক প্রকৃতির শান্ত ছেলে। আমার ইচ্ছা ছিল, 'পারিয়া'-র থেকে একেবারে অন্যরকম একটা চরিত্রে ওকে কাস্ট করব। আমার মনে হয়, 'রাস' দেখে মানুষের ধারণা হবে, বিক্রম আবেগ, সারল্য এই সমস্ত কিছু ও সমান সার্থকতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলতে পারে। আর 'রাস'-এর নারী চরিত্র লেখার সময়েই আমার দেবলীনার কথা মনে হয়েছিল। ও যখন হাসে, ওর চোখও হাসে। রাই-এর চরিত্রের সঙ্গে দেবলীনার মিল রয়েছে। দুটো চরিত্রই বাঁচতে ভালবাসে। এই ছবির চিত্রনাট্য লেখা পরে আমি বিক্রম আর দেবলীনার কথাই ভেবেছিলাম। আমার সৌভাগ্য যে ওরা দুজনেই রাজি হয়েছে। নাহলে হয়তো অন্য কাউকে ভাবতে হত।'
নিজে সিনেমা বানাচ্ছেন, কিন্তু মুখ্য ভূমিকায় নিজেকে ভাবছেন না তথাগত! কেন? অভিনেতা পরিচালক হেসে ফেলে বললেন, 'আমার কাছে পরিচালনা করতে করতে অভিনয় করাটা ভীষণ কঠিন। সেই কারণেই আমি চেষ্টা করি আমায় যত কম ক্যামেরার সামনে আসতে হয়। আর আমি আমার সিনেমার মাধ্যমে আত্মপ্রচার চাই না। সেই কারণেই নিজের ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে নিজে অভিনয়ের কথা কখনও ভাবিনি। ভবিষ্যতেও ভাবব না।' পরিচালনা নাকি অভিনয়, কোনটাকে বেশি উপভোগ করেন তথাগত? উত্তর এল, 'দুটোই। আমি দীর্ঘদিন ধরেই তো ধারাবাহিকে অভিনয় করছি। পাশাপাশি আমার চ্যানেল আর প্রযোজনা সংস্থা সুবিধা দিচ্ছে বলেই ছবি পরিচালনাটাও করতে পারছি।' তবে যদি এই দুইয়ের মধ্যে থেকে কোনও একটাকে বেছে নিতে হয়? তথাগত হাসতে হাসতে বললেন, 'যদি আমি খেতে না পাই, তাহলে অভিনয়টাকে বেছে নেব। আর যদি প্যাশনের জন্য কাজ করতে হয়, তাহলে পরিচালনা করব।'
আগামীতে একাধিক ছবি করার পরিকল্পনা রয়েছে তথাগতর। ইন্ডাস্ট্রির কোন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে? তথাগত বলছেন, 'সবার সঙ্গে.. কাকে বাদ দিয়ে কার নাম বলব। নতুন থেকে পুরনো, সমস্ত অভিনেতা অভিনেত্রীর সঙ্গেই কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে। তবে আমার সেটে কোনও তারকাসুলভ বায়নাক্কা চলবে না। এতে আখেরে ছবির ক্ষতি হয়। কোনও অভিনেতা যদি বলেন, তিনি রিহার্সাল করবেন না বা ওয়ার্কশপ করবেন না, তাঁকে নিয়ে কাজ করতে আমার সমস্যা হবে। তবে এমন নয় যে, তিনি তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য চাইবেন না। অবশ্যই চাইবেন। কিন্তু তাঁর কোনও ব্যবহারে অন্য অভিনেতা বা ক্রু-দের অসুবিধার সৃষ্টি হলে তাঁর সঙ্গে কাজ করা মুশকিল।'