একই বয়সের অন্য বাচ্চারা যেখানে লম্বা হচ্ছে, সেখানে কেউ কেউ যেন থমকে যাচ্ছে উচ্চতার দৌড়ে। বাবা-মায়ের চিন্তা এইসময় অনেকটাই বাড়ে। অনেক সময় সমস্যার আসল কারণ ধরা পড়ে না। শিশুর এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি থেমে যাওয়ার পিছনে অন্যতম কারণ কী হতে পারে?  শুধু খাবারের অভাব নয়, এর পিছনে থাকতে পারে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি। এই হরমোন ঠিক কী কাজ করে, শরীরের কোথা থেকে নিঃসৃত হয় এবং কখন চিকিৎসা শুরু করলে সবচেয়ে বেশি সুফল পাওয়া যায়—এই সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন ইনস্টিটিউট অফ চাইল্ড হেলথ (ICH), কলকাতার পেডিয়াট্রিক্স বিভাগের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ জয়দেব রায়।

Continues below advertisement

এবিপি লাইভকে ইনস্টিটিউট অফ চাইল্ড হেলথ (ICH), কলকাতায় পেডিয়াট্রিক্স (শিশুচিকিৎসা) বিভাগের একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক এবং অধ্যক্ষ জয়দেব রায় গ্রোথ হরমোন নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন। এই হরমোন কী, শরীরের কোথা থেকে এবং কতটা এই হরমোন নির্গত হয়, কীভাবে এই হরমোনের ঘাটতি মেটানো সম্ভব, ঠিক কোন বয়সে এই হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়লে চিকিৎসাক্ষেত্রে সুবিধা হয়।

বিশিষ্ট চিকিৎসক জয়দেব রায় বলেন, "গ্রোথ হরমোন নামটা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, গ্রোথ মানে বৃদ্ধি, অর্থাৎ বৃদ্ধির হরমোন। গ্রোথ হরমোন যে কোনও বাচ্চাকে বাড়তে সাহায্য করে। ছোটবেলার কারও শরীরে যদি গ্রোথ হরমোন ঘাটতি হয়, তা হলে সেই বাচ্চা ঠিকমতো বাড়ে না। ছোটখাটই থেকে যায়। তবে কারও শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি হলে সে শুধু শরীরের আকারের দিক থেকে ছোটই হয় না, তার শারীরিক গঠনও ঠিক হয় না। আর শারীরিক গঠন ঠিক করতে সাহায্য করে গ্রোথ হরমোন। অনেক বাচ্চার শুধু উচ্চতাই কম হয়, তা নয়। সঙ্গে কিছু কিছু বাচ্চা একটু মোটা বেশি হয়। অর্থাৎ যদি কোনও কম উচ্চতার ও মোটা বাচ্চা দেখা যায়, তা হলে দেখতে হবে তার কোনওরকম হরমোনের ঘাটতি আছে কি না। যেটা হতে পারে গ্রোথ হরমোন ঘাটতি, বা থাইরয়েডের ঘাটতিও।"

Continues below advertisement

আরও পড়ুন: রাতের খাওয়া কেন তাড়াতাড়ি সেরে নেবেন? কী কী উপকার, ডিনারের মেনু কেমন হওয়া উচিত

বাইরে থেকে শরীরে গ্রোথ হরমোন প্রবেশ করানো যায় ? যখন গ্রোথ হরমোন ঘাটতি বোঝা যায়, তাতে হাড়ের বয়স কত, সেটা পরীক্ষা করে মাপা যায়। যাদের শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি হয়, তাদের হাড়ের বয়স কম হয়। বাইরে থেকে গ্রোথ হরমোন শরীরের ভেতরে প্রবেশ করানো হলে শারীরিক গঠন ঠিক হয়ে যায়। উচ্চতাও ঠিক হয়। এবং হাড়ের বয়সও ঠিক হয়ে যায়।

কোথা থেকে নির্গত হয় গ্রোথ হরমোন ?

চিকিৎসক জয়দেব রায় বলেন, "গ্রোথ হরমোন ব্রেনের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে বের হয়। দিনের এক এক সময় এক এক পরিমাণের গ্রোথ হরমোন বের হয়। তাই এটা নির্ণয় করা বেশ কঠিন। গ্রোথ হরমোন স্টিমুলেশন টেস্ট দিয়ে গ্রোথ হরমোনের পরিমাণ দেখা হয়। সারাদিন ধরে সিমুলেশন করে দেখা হয়। একটা প্রিলিমিনারি স্ক্রিনিং করা যায়। IGF1 এবং IGF BP3 এই দুই পরীক্ষা করতে হয়। এরপর ডাইরেক্ট গ্রোথ হরমোন মাপার কথা ভাবা হয়। সেই সময় এর আসল কারণ খোঁজার চেষ্টা করা হয়। যদি প্রয়োজন হয়, তা হলে ব্রেনের এমআরআইও করা হয়। পিটুইটারি কী অবস্থায় আছে, তা দেখতে হয়।"

গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি থেরাপি দিয়ে অনেকটা ঠিক করে নেওয়া যায়। এর জন্য চিকিৎসা অল্প বয়সেই শুরু করতে হয়। শিশু বিশেষজ্ঞ জয়দেব রায় জানান, যদি বয়ঃসন্ধির পর গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি শনাক্ত করা হয়, তা হলে এটা সারানো কঠিন হয়ে পড়ে। গ্রোথ হরমোন বাইরে থেকে শরীরের ভেতর প্রবেশ করিয়ে যেমন শারীরিক গঠন যাদের ঠিক নয়, তাদের ঠিক করা যায়, তাছাড়া আরও অনেক রোগে গ্রোথ হরমোন ব্যবহার করা হয়। যেমন - টার্নার সিন্ড্রোম জেনেটিক রোগ, এতে গ্রোথ হরমোন কমে যায়। এটি মেয়েদের বেশি দেখা দেয়, তাতে গ্রোথ হরমোন শরীরের ভেতর প্রবেশ করানো করা হয়। এছাড়া খুবই কম ওজনের বাচ্চার চিকিৎসা করার পরও সে যদি না বাড়ে, সেক্ষেত্রে গ্রোথ হরমোন দেওয়া হয়। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে গ্রোথ হরমোনের রেজিসট্যান্স (শরীরে গ্রোথ হরমোন পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকা সত্ত্বেও, কোষগুলো সেই হরমোনের সংকেত সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না বা সাড়া দিতে পারে না) শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতেও শরীরে গ্রোথ হরমোন দিতে হয়। এগুলোই গ্রোথ হরমোন থেরাপি।