নিউ ইয়র্ক: মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন তিনি। তবে প্রাণে বাঁচলেও শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাননি আমেরিকার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি ক্রিস্টা পাইক। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ চেষ্টার প্রায় এক মাস পর প্রথমবার প্রকাশ্যে মুখ খুললেন ৫০ বছর বয়সি এই মহিলা। তাঁর কথায়, শরীরের প্রতিটি অংশে যন্ত্রণা হচ্ছে। শুধু শারীরিক নয়, মনের গভীরেও জমে রয়েছে অসহনীয় যন্ত্রণা।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর টেনেসি প্রদেশে প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন দিয়ে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া সফল হয়নি। বরং গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। কয়েকদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর জ্ঞান ফেরে তাঁর। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর এই প্রথম নিজের অনুভূতির কথা জানালেন তিনি।
আইনজীবীদের মাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে ক্রিস্টা জানিয়েছেন, সেই রাতের পর থেকে এমন কোনও মুহূর্ত যায়নি যখন তিনি যন্ত্রণামুক্ত ছিলেন। তাঁর হাত, বাহু, শরীর এবং গলায় প্রবল ব্যথা রয়েছে। এখনও ঠিকমতো কথা বলতেও সমস্যা হচ্ছে তাঁর। ক্রিস্টার কথায়, এই যন্ত্রণা শুধু শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর মন এবং আত্মাকেও গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপটও যথেষ্ট চাঞ্চল্যকর। ১৯৯৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে নিজের প্রেমিকের সঙ্গে মিলে ১৯ বছরের সহপাঠী কলিন স্লেমারকে নৃশংসভাবে খুন করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন ক্রিস্টা। তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। টেনেসি প্রদেশে প্রায় ২০০ বছর পর প্রথম কোনও মহিলার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ছিল তাঁর ক্ষেত্রেই। সেই মৃত্যুদণ্ড প্রত্যক্ষ করতে নিহত তরুণীর মা-ও ফ্লোরিডা থেকে এসেছিলেন।
কিন্তু ৩০ সেপ্টেম্বর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় একাধিক সমস্যা দেখা দেয়। ক্রিস্টার শরীরে পেন্টোবারবিটাল নামের প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের জন্য শিরায় আইভি লাইন বসাতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, ওষুধটি ঠিকমতো রক্তপ্রবাহে মিশতে পারেনি। বরং বাহুর টিস্যুতে জমে গিয়ে পুড়ে যাওয়ার মতো ক্ষত এবং ফোসকা তৈরি করে। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভেন্টিলেটরে রাখতে হয়। কয়েকদিন তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছিল।
নিজের বিবৃতিতে ক্রিস্টা জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন তিনি মৃত্যুর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন। প্রিয়জনদের কাছ থেকে বিদায়ও নিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েকদিন পর যখন হাসপাতালের বিছানায় জ্ঞান ফেরে, তখন তিনি একা, বিভ্রান্ত এবং যন্ত্রণায় কাতর। কেন তিনি বেঁচে গেলেন, পরবর্তী সময়ে কী অপেক্ষা করছে, তা কিছুই বুঝতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে নিজের শারীরিক অবস্থার কথা জানালেও নিহত সহপাঠীর পরিবারের যন্ত্রণার কথাও উল্লেখ করেছেন ক্রিস্টা। তাঁর বক্তব্য, এই ঘটনায় কলিন স্লেমারের পরিবার যে ভয়াবহ ক্ষতি ও যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে, সেই কথা তিনি এখনও ভাবেন।
এদিকে, এই ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড ঘিরে আমেরিকায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে টেনেসি প্রশাসনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন প্রদেশের গভর্নর বিল লি। একই সঙ্গে চলতি বছরে নির্ধারিত অন্য একটি মৃত্যুদণ্ডের প্রক্রিয়াও স্থগিত রাখা হয়েছে। ঘটনার জেরে টেনেসির সংশোধনাগার বিভাগের কমিশনার ফ্র্যাঙ্ক স্ট্রাডাও পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন।
বর্তমানে জেল হাসপাতালের চিকিৎসা বিভাগে রয়েছেন ক্রিস্টা। তাঁর আইনজীবীরা গভর্নরের কাছে মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করার আবেদন জানিয়েছেন। তবে গভর্নরের বক্তব্য, আদালত অন্য কোনও সিদ্ধান্ত না নিলে তাঁর সাজা বহাল থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
