নয়াদিল্লি: ইরানের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্যেও নজর পড়েছে আমেরিকার। আরও ২৫ শতাংশ হারে শুল্ক দিতে হবে কি না, সেই নিয়ে উদ্বেগে দিল্লি। তবে শুধুমাত্র বাণিজ্যশুল্কই নয়, ভারতের জন্য আরও বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে চবাহার বন্দর। ২০২৫  সালের ২৯ অক্টোবর আমেরিকার ট্রেজ়ারি বিভাগের তরফে ছ’মাসের জন্য ভারতকে নিষেধাজ্ঞা থেকে আংশিক ছাড়পত্র দেওয়া হয়। চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত সেই ছাড়পত্র কার্যকর থাকার কথা। তবে ইরানের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য নিয়ে নতুন করে যে শুল্কশাস্তির ঘোষণা করেছে, তাতে ‘শাহিদ বেহেশতি’ টার্মিনাল-সহ চবাহার বন্দরের অন্য অংশ থেকে ভারতকে যাবতীয় কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে হবে কি না, উঠছে প্রশ্ন। (Chabahar Port)

Continues below advertisement

ইরানের চবাহার বন্দর কৌশলগত দিক থেকে ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমেরিকার চোখরাঙানির সামনে ভারত চবাহার থেকে সরে আসছে বলে সরগরম আন্তর্জাতিক মহলও। এমনকি কংগ্রেসের তরফেও সেই নিয়ে আক্রমণ করা হয় নরেন্দ্র মোদি সরকারকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা লেখে, ‘সাধারণ মানুষের ১২০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১০৮২ কোটি টাকা) চবাহার পোর্টে বিনিয়োগ করেছিল মোদি সরকার। কিন্তু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপে সেই টাকা জলে গিয়েছে’। আমেরিকার নীতির সামনে নতি স্বীকার করে মোদি সরকার ভারতের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে আপস করেছে বলেও দাবি করে কংগ্রেস। ওয়াশিংটনের ইরান নীতির কাছে নতি স্বীকার করে দিল্লি ভারতের কৌশলগত স্বার্থের সাথে আপস করেছে বলেও অভিযোগ কংগ্রেসের। (India Iran Trade)

সেই নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে ভারতের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর আমেরিকার ট্রেজ়ারি বিভাগ একটি চিঠি জারি করে ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা থেকে আংশিক ছাড়পত্র দিয়েছিল ভারতকে। আমেরিকার সঙ্গে সেই নিয়ে কথাবার্তা চলছে আমাদের।” গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে ইরানের উপর যখন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপায় আমেরিকা, সেই সময় আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং মানবিক লেনদেনকে মাথায় রেখে চবাহার বন্দর নিয়ে ভারতকে আংশিক ছাড়পত্র দিয়েছিল তারা। চবাহারের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত স্বার্থ জড়িয়ে বলেই ভারতকে বাড়তি ছ’মাস সময় দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। 

Continues below advertisement

তাই এবার চবাহার থেকে ভারতকে পাততাড়ি গোটাতে হবে কি না, প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কারণ তেমনটা ঘটলে কৌশলগত দিক থেকে জোর ধাক্কা খেতে হবে ভারতকে। যদিও দিল্লি সূত্রে খবর, এখনও আমেরিকার সঙ্গে কথাবার্তা চলছে ভারতের। চবাহার ছেড়ে বেরিয়ে আসার প্রশ্নই ওঠে না। কৌশলগত দিক থেকে ভারতের জন্য় চবাহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিষেধাজ্ঞার সমস্ত শর্ত মেনে চলতে যে রাজি ভারত, তা আমেরিকাকে বোঝানো হবে।

চবাহার শব্দটির অর্থ ‘চারটি ঝর্না’। গুজরাতের কান্দলা বন্দর থেকে দূরত্ব ৫৫০ নটিক্যাল মাইল। ওই বন্দরের মাধ্য়মেই পাকিস্তানকে টপকে আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপে ব্যবসা বাণিজ্য চালায় ভারত। ইরানের দক্ষিণ-পূর্বে, ওমান উপসাগরে, হরমুজ প্রণালীর একেবারে মুখে অবস্থিত চবাহার বন্দর। চবাহারের মাধ্যমেই সরাসরি ভারত মহাসাগরের নাগাল পায় ইরান। চবাহার বন্দর প্রস্তাবিত ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডরেরও অংশ, যার মাধ্যমে ভারত মহাসাগর এবং পারস্য উপসাগর যুক্ত হবে কাস্পিয়ান সাগরকে। পাশাপাশি, সেন্ট পিটার্সবার্গ হয়ে উত্তর ইউরোপের সঙ্গেও সংযোগ গড়ে উঠবে। 

ভারত, ইরান, আফগানিস্তান, আর্মেনিয়া, আজেরবাইজান, রাশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্য বাণিজ্য চালাতেই চবাহার বন্দরের নির্মাণ। ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর গড়ে উঠলে সুয়েজ খালের চেয়েও ১৫ দিন কম সময় লাগবে বাণিজ্যে। ২০০৩ সালে চবাহার বন্দর উন্নয়নে সম্মত হয় ভারত। কিন্তু ইরানের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকায়, সেই সময় কাজকর্ম থমকে যায়। ২০১৬ সালে ভারত, ইরান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় শেষ পর্যন্ত। বন্দর নির্মাণে আর্থিক সহযোগিতা প্রদানে সম্মত হয় ভারত। ২০২৪ সালে ইরানের সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তি হয় ভারতের, যার আওতায় সেখানে ৩৭০ মিলিয়ন ডলার ( প্রায় ৩৩৩৬ কোটি টাকা) বিনিয়োগ করার কথা জানায় ভারত। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের অর্থনীতিকে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার (৯০.১৭ লক্ষ কোটি) এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে (১৩৫২৫৫ লক্ষ কোটি) নিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য দিল্লির। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, প্রয়োজন স্থিতিশীল বাণিজ্যপথের। সেই কারণে চবাহার ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে চবাহারের জন্য ১২০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১০৮২ কোটি টাকা) পাঠানো হয়েছে। চবাহারে ভারত সরকাররে প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়ে যাতে প্রশ্ন না ওঠে, তার জন্য নতুন একটি গোষ্ঠী তৈরির পরিকল্পনাও চলছে। তবে এই মুহূর্তে আমেরিকার চোখরাঙানি ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়ার থেকে তেল কেনার জন্য আগেই দু’দফায় ভারতের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছে আমেরিকা। ইরানের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য করা দেশগুলির উপর আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানোর ঘোষণাও করেছে তারা। এমন পরিস্থিতিে মেপে মেপে পা ফেলছে ভারত।