নয়াদিল্লি: ভারতকে ‘হিন্দুরাষ্ট্রে’ পরিণত করার যে দাবি, তার সঙ্গে বার বার রাষ্ট্রীয় স্বয়মসেবক সঙ্ঘের (RSS) নাম উঠে এসেছে। বিজেপি-র মাধ্যমে সঙ্ঘ সেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে অভিযোগ শোনা যায়। কিন্তু সঙ্ঘ-প্রধান মোহন ভাগবতের দাবি, সঙ্ঘের কোনও রাজনৈতিক দল নেই। শুধু তাই নয়, মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ সঙ্ঘে জায়গা পাবেন কি না, জানতে চাইলেও নিজের অবস্থান জানালেন ভাগবত। (Mohan Bhagwat)
বেঙ্গালুরুতে সঙ্ঘের ১০০ বছর উদযাপনে দু’দিনের বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। সেখানে ভাগবত দাবি করেন, জাতপাত, ধর্মের নিরিখে সদস্যদের মধ্যে বিভাজন ঘটায় না সঙ্ঘ। বরং জাতীয় ঐক্যকে সামনে রেখেই কাজ করে। সঙ্ঘে মুসলিমদের জায়গা হবে কি না জানতে চাইলে বলেন, “সঙ্ঘে কোনও ব্রাহ্মণের জায়গা নেই, অন্য কোনও জাত, মুসলিম, খ্রিস্টান, কারও জায়গা নেই। শুধুমাত্র হিন্দুদের আসার অনুমতি রয়েছে। মুসলিম হোন বা খ্রিস্টান বা অন্য যে কোনও সম্প্রদায় সঙ্ঘে শামিল হতে পারেন। কিন্তু নিজের বিচ্ছিন্নতা বাইরে রেখে আসতে হবে।”
ভাগবত আরও বলেন, “শাখায় এলে, ভারত মাতার সন্তান হিসেবে আসুন। হিন্দু সমাজের সদস্য হিসেবে। মুসলিম, খ্রিস্টানরাও শাখায় আসেন। কিন্তু আমরা তাঁদের গুনেও দেখি না, তাঁরা কে, জিজ্ঞেসও করি না। আমরা ভারত মাতার সন্তান। সঙ্ঘ এভাবেই কাজ করে। সকলের কাছে পৌঁছনোর প্রকল্প রয়েছে। কিন্তু সঙ্ঘের নীতি হল, আমরা কারও জন্য কিছু করব না। প্রত্যেককে নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে। ঈশ্বরও তাঁদেরই সাহায্য় করেন, যাঁরা নিজেদের সাহায্য করেন। কোনও প্রত্যাশা ছাড়াই সঙ্ঘে আসতে হবে। স্বয়ং নিজেকে নিজে কী করে উদ্ধার করবেন, আমরা শুধু তার যোগ্য করে তুলতে পারি। ভাল কাজে সাহায্য় করতে পারি আমরা। স্বয়ংসেবকদের পৃথক সংগঠন রয়েছে।”
সঙ্ঘ কোনও ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে না বলেও দাবি করেন বাগবত। তাঁর বক্তব্য, “আমরা কোনও রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করি না। নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নিই না আমরা। সঙ্ঘ সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ করে, রাজনীতি বিভাজনমূলক। আমরা শুধু নীতিকে সমর্থন করি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমরা অযোধ্যায় রামমন্দির চাইছিলাম। রামমন্দির নির্মাণের যাঁরা এগিয়ে আসেন, স্বয়মসেবকরা তাঁদের ভোট দিয়েছেন। কংগ্রেস যদি ওই দাবিকে সমর্থন করত, স্বয়মসেবকরা তাদেরও ভোট দিতেন। কোনও একটি দলের প্রতি বিশেষ অনুরাগ নেই আমাদের। সঙ্ঘ পার্টি বলে কিছু নেই, কোনও দল আমাদের নয়। সব দলই আমাদের, কারণ তারা ভারতের দল। আমরা রাষ্ট্রনীতিকে সমর্থন করি, রাজনীতিকে নয়। আমাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, নির্দিষ্ট দিকে দেশকে এগিয়ে যেতে দেখতে চাই। যারা দেশকে সেই দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, তাদেরই সমর্থন করব।”
এখনও পর্যন্ত সঙ্ঘ সংগঠন হিসেবে নাম নথিভুক্ত করেনি কেন জানতে চাইলে ভাগবত বলেন, “অসংখ্য বার এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যাঁরা প্রশ্ন তুলতে চান, তাঁরা তুলবেনই। ২৯২৫ সালে সঙ্ঘের যাত্রা শুরু হয়। আমরা কি ইংরেজ সরকারের সঙ্গে নথিভুক্ত হতাম? স্বাধীনতার পর নথিভুক্তিকরণ বাধ্যতামূলক হয়নি। কয়েকজন ব্যক্তিকেও আইনি স্বীকৃতি দেওয়া যায়। আমরা কয়েক জন ব্যক্তি হিসেবেই শ্রেণিভুক্ত, আমরা একটি স্বীকৃত সংগঠন। তিন বার আমাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অর্থাৎ সরকার স্বীকৃতি দিয়েছে। আমরা না থাকলে নিষিদ্ধ করল কী করে? প্রত্যেক বারই আদালত নিষেধাজ্ঞা খারিজ করে দেয়। আইনত, বাস্তববিক ভাবে আমরা একটি সংগঠনই। আমরা অসাংবিধানিক নই…তাই নথিভুক্তিকরণের প্রয়োজন নেই।” যত বিরোধিতা হয় সঙ্ঘ ততই শক্তিশালী হয়ে ওঠে বলেও দাবি করেন ভাগবত। গত মাসেই কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে সঙ্ঘকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে সওয়াল করেন। সেই আবহেই এমন মন্তব্য করলেন ভাগবত।
ভারতের জাতীয় পতাকা, তেরঙ্গা নিয়ে সঙ্ঘের অবস্থান জানতে চাইলে ভাগবত জানান, ১৯২৫ সালে সঙ্ঘ নিজেদের গেরুয়া পতাকা গ্রহণ করে। ১৯৩৩ সালে তেরঙ্গাকে জাতীয় পতাকা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ভাগবতের বক্তব্য, “পতাকা কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে গেরুয়া পতাকাকে গ্রহণ করে। কিন্তু পরে মহাত্মা গাঁধী হস্তক্ষেপ করেন। কিছু কারণে উনি তিনটি রংয়ের কথা বলেন, সবার উপরে গেরুয়া। গোড়া থেকেই পতাকাকে সম্মান করে আসছে সঙ্ঘ, তেরঙ্গাকে রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সঙ্ঘ। কমিউনিস্ট পার্টির লাল পতাকা রয়েছে, কংগ্রেসের তেরঙ্গা পতাকা আছে চরকা-সহ। রিপাবলিকান পার্টির নীল পতাকা রয়েছে। তেমনই আমাদেরও গেরুয়া পতাকা আছে। জাতীয় পতাকাকেও সম্মান করি আমরা।”