নয়াদিল্লি: প্রায় একই সময় জন্ম। প্রচুর মিলও রয়েছে তাদের মধ্যে। পৃথিবীর 'যমজ বোন' শুক্রগ্রহের দিকে এবার নজর ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ISRO-র। শুক্রগ্রহের উদ্দেশে এবার মহাকাশযান পাঠাতে চলেছে তারা। বেশ কিছু দিন ধরেই তার প্রস্তুতি চলছিল, তবে সরকারি অনুমোদন মিলেছে অতি সম্প্রতি। এবার শুক্রগ্রহ অভিযানের দিন-ক্ষণ ঘোষণা করল ISRO. (ISRO Shukrayaan 1 Mission)
গত ১৮ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা শুক্রগ্রহ অভিযান, Venus Orbiter Mission (VOM)-এ অনুমোদন দেয়। এই অভিযানের আওতায় ১১২ দিনের যাত্রাপথ শেষে শুক্রগ্রহের কাছে পৌঁছবে ISRO-র 'শুক্রযান ১' মহাকাশযান। ISRO জানিয়েছে, ২০২৮ সালের ২৯ মার্চ 'শুক্রযান ১' মহাকাশযানের উৎক্ষেণ। ওই মহাকাশযানে ভর করে এই প্রথম শুক্রের অন্দরমহলে উঁকি দেবে ভারত। (Venus Orbiter Mission Launch Date)
ISRO জানিয়েছে, 'শুক্রযান ১' অভিযান তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই অভিযানে শক্তিশালী LVM-3 (Launch Vehicle Mark 3) উৎক্ষেপণযান ব্যবহার করা হবে। এই LVM-3 'শুক্রযান ১' মহাকাশযানকে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে দেবে। ১১২ দিনের যাত্রাপথ পেরিয়ে, ২০২৮ সালের ১৯ জুলাই গন্তব্যে পৌঁছবে 'শুক্রযান ১'।
শুক্রগ্রহের বায়ুমণ্ডল নিয়ে গবেষণায় সাহায্য করবে 'শুক্রযান ১'। অত্যাধুনক প্রযুক্তির সাহায্যে শুক্রগ্রহের মাটি, ভৌগলিক চরিত্র খুঁটিয়ে দেখবে। শুক্রগ্রহের বায়ুমণ্ডলের উপাদান, মাটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট, আগ্নেয়গিরির উপস্থিতি এবং সেখানে ভূমিকম্পের প্রবণতা কেমন, সব কিছু কাটাছেঁড়া করে দেখা হবে।
'শুক্রযান ১' মহাকাশযানে অত্যাধুনিক সরঞ্জাম থাকবে, যার মধ্যে রয়েছে সিন্থেটিক অ্যাপার্চার রেডার, ইনফ্র্যারেড ও আল্ট্রাভায়োলেট ক্যামেলা এবং সেন্সর। এর মধ্যে কার, কী কাজ, তা-ও জানিয়েছে ISRO-
- VSAR (Venus S-Band Synthetic Aperture Radar)- শুক্রগ্রহের বুকে সক্রিয় আগ্নেয়গিরির সন্ধান চালানো, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরার সাহায্যে মানচিত্র তৈরি, নিখুঁত ভৌগলিক বিবরণ, মাটির গঠন নির্ধারণ।
- VSEAM (Venus Surface Emissiivity And Atmospherinc Mapper)- শুক্রগ্রহের ভূমি এবং বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ। অগ্ন্যুৎপাত প্রবণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, মেঘের গঠন নিরীক্ষা এবং বাস্পের মানচিত্রকরণ।
- VTC (Venus Thermal Camera)- শুক্রগ্রহের মেঘে তাপমাত্রার ওঠাপড়া পর্যবেক্ষণ।
- VCMC (Venus Cloud Monitoring Camera)- আলোক তরঙ্গ, বজ্রপাত নিরীক্ষণ।
- LIVE (Lightning Instrument for Venus)- শুক্রগ্রহের বায়ুমণ্ডলে বিদ্যুৎ শক্তির প্রভাব, প্লাজমা নির্গমন নিরীক্ষণ।
- VASP (Venus Atmospheric Spectropolarimeter)- মেঘের উপাদান নির্ধারণ।
- SPAV (Solar Occulation Photometry)-শুক্রগ্রহের বায়ুমণ্ডলে সূক্ষ্ম কণা এবং কুয়াশার উপস্থিতি নির্ধারণ।
ISRO-র 'শুক্রযান ১' অভিযান একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। রাশিয়া, ফ্রান্স, সুইডেন, জার্মানিও এই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সুইডেনের ইনস্টিটিউট অফ স্পেস ফিজিক্স Venusian Neutrals Analyzer সরঞ্জাম প্রদান করবে, যা শুক্রগ্রহের বায়ুমণ্ডলে সূর্যালোক থেকে নির্গত কণার প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে। 'শুক্রযান ১' অভিযানের জন্য ১২৩৬ কোটি টাকার অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
আকারে-আয়তনে এমনকি জন্মলগ্নের নিরিখে পৃথিবী এবং শুক্রগ্রহের মধ্যে মিল রয়েছে বিস্তর। যে কারণে পৃথিবী এবং শুক্রগ্রহকে যমজ বোন বলেও উল্লেখ করেন কেউ কেউ। তবে শস্য-শ্যামল পৃথিবীর মতো কোমল নয়, বরং শুক্রগ্রহ ভীষণ দুষ্টু বলেই মত বিজ্ঞানীদের। কিন্তু সৃষ্টির গোড়ার দিকে পৃথিবী এবং শুক্রগ্রহের মধ্যে এই পার্থক্য ছিল না বলে মত বিজ্ঞানীদের। তাঁদের দাবি, সময়ের সঙ্গে রাস্তা আলাদা হয়ে গিয়েছে দুই গ্রহের। সময় পৃথিবীর অনুকুল হয়ে থেকেছে, প্রতিকূলে গিয়েছে শুক্রগ্রহের।
দুই গ্রহের ভর এবং ঘনত্বও প্রায় সমান সমান। আজ থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে সৃষ্টি দুই গ্রহেরই। শুক্রগ্রহে জলের অস্তিত্ব নেই। বিষাক্ত গ্যাসে ঢাকা বায়ুমণ্ডল। কার্বন ডাই অক্সাইডের আধিক্য থাকার পাশাপাশি সালফিউরিক অ্যাসিডের মেঘে ঢাকা, যার আস্তরণ প্রায় ২৪ কিলোমিটার পুরু। পৃথিবীর তুলনায় বায়ুমণ্ডলের চাপ ৯০ গুণ বেশি। সৌরজগতের সব গ্রহের মধ্যে শুক্রগ্রহের তাপমাত্রাই সবচেয়ে বেশি, ৪৭৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বায়ুমণ্ডল কার্বন ডাই অক্সাইডে পরিপূর্ণ হওয়াতেই এত তাপমাত্রা। শুক্রগ্রহের বায়ুমণ্ডলে আটকে পড়ে সূর্যরশ্মি, এর ফলেও বৃদ্ধি পায় তাপমাত্রা।
পৃথিবী এবং শুক্রগ্রহের গতিপথও পরস্পরের পরিপন্থী। পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে আবর্তিত হয়। শুক্রগ্রহ ঘোরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে। পৃথিবী যেখানে কক্ষপথে ২৩.৫ ডিগ্রি হেলে থাকে, সেখানে শুক্র হেলে থাকে ১৭৭.৩৬ ডিগ্রি। পৃথিবীর আকাশে সূর্য পূর্বে উদয় হয়, অস্ত যায় পশ্চিমে।
শুক্রগ্রহে ঠিক এর উল্টো। শুক্রগ্রহের গতিও অত্যন্ত শ্লথ। সেখানকার একটি দিন পৃথিবীর ২৪৩ দিনের সমান। কিন্তু গোড়ার দিকে শুক্রগ্রহ এমন ছিল না বলে দাবি বিজ্ঞানীদের। তাঁদের মতে, একসময় শুক্রগ্রহেও জলের অস্তিত্ব ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তা উবে গিয়েছে। মূলত সৌরঝড়ের প্রকোপেই এমন অবস্থা।
নিয়ত অগ্ন্যুৎপাতের জেরেই শুক্রগ্রহের বায়ুমণ্ডল বিষাক্ত হয়ে উঠেছে বলে মত বিজ্ঞানীদের। কিন্তু শুক্রগ্রহের বুকে এমন কত আগ্নেয়গিরি রয়েছে, সেগুলি কতটা সক্রিয়, সে ব্যাপারে সুনিশ্চিত ধারণা পাওয়া যায়নি এখনও পর্যন্ত। তাই আগামী দিনে পৃথিবীর ভবিতব্যও একই হতে পারে কি না, সেই নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই শুক্রগ্রহ অভিযানের উপর জোর দিচ্ছে সব দেশই।