নয়া দিল্লি: মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম হাবল স্পেস টেলিস্কোপ। কয়েক দশক ধরে মহাবিশ্বের অজানা রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এই টেলিস্কোপ। দূরবর্তী ছায়াপথ, নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের বয়স সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা তৈরিতে বড় অবদান রয়েছে হাবলের। কিন্তু এবার সেই হাবল টেলিস্কোপের ভবিষ্যৎ নিয়েই তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। ক্রমশ পৃথিবীর দিকে নেমে আসছে তার কক্ষপথ। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, কোনও ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ২০৩৩ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে এই ঐতিহাসিক মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। আর সেই সম্ভাবনা ঠেকাতেই এবার নতুন করে উদ্যোগী হয়েছে NASA।

Continues below advertisement

হাবলকে বাঁচাতে বেসরকারি সংস্থার সাহায্য চাইছে NASA

NASA-র সাম্প্রতিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, হাবলকে রক্ষা করতে বেসরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলির কাছ থেকে প্রযুক্তিগত প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। গত ২৯ অক্টোবর এ বিষয়ে একটি Request for Information (RFI) জারি করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। কীভাবে হাবলকে আরও উঁচু কক্ষপথে নিয়ে যাওয়া যায়, কীভাবে তার পরিষেবা ও প্রযুক্তিগত উন্নতি করা সম্ভব, কিংবা তার কাজ শেষ হলে কীভাবে নিরাপদে মহাকাশ থেকে সরানো যায়, সেই বিষয়ে বেসরকারি সংস্থাগুলির মতামত জানতে চেয়েছে NASA।

Continues below advertisement

NASA-র প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যানের বক্তব্য, হাবলের এখনও গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কাজ বাকি রয়েছে। তাই যতদিন সম্ভব এই টেলিস্কোপকে সচল রাখার প্রতিটি যুক্তিসঙ্গত ও আর্থিকভাবে কার্যকর উপায় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নতুন কোনও মহাকাশ অভিযান পরিচালনার তুলনায় বিদ্যমান টেলিস্কোপের আয়ু বাড়ানো সম্ভব হলে তাতে বিজ্ঞান ও অর্থ, দুই ক্ষেত্রেই লাভ হতে পারে।

কেন পৃথিবীর দিকে নেমে আসছে হাবল?

১৯৯০ সালের এপ্রিলে মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল হাবল স্পেস টেলিস্কোপ। পৃথিবী থেকে প্রায় ৫৪০ কিলোমিটার উচ্চতায় প্রদক্ষিণ করছে এটি। কিন্তু এই উচ্চতাতেও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অত্যন্ত পাতলা স্তরের অস্তিত্ব রয়েছে। মহাকাশে চলাচলের সময় সেই গ্যাসের সঙ্গে ঘর্ষণ বা বায়ুর বাধার ফলে ধীরে ধীরে গতি ও কক্ষপথের উচ্চতা কমছে হাবলের।

সমস্যা হল, হাবলের নিজস্ব এমন কোনও প্রপালশন ব্যবস্থা নেই, যার সাহায্যে নিয়মিতভাবে কক্ষপথের উচ্চতা বাড়িয়ে নিতে পারে সে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এই উচ্চতা কমার প্রক্রিয়া চলছে। NASA-র হিসাব অনুযায়ী, কোনও বাহ্যিক সাহায্য না পেলে ২০৩৩ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে হাবল।

কীভাবে বাঁচানো সম্ভব এই ঐতিহাসিক টেলিস্কোপকে?

হাবলকে বাঁচানোর জন্য NASA-র সামনে একাধিক সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, একটি বিশেষ মহাকাশযান পাঠিয়ে হাবলকে ধাক্কা দিয়ে আরও উঁচু কক্ষপথে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এতে তার কক্ষপথের উচ্চতা বাড়বে এবং আরও কয়েক বছর বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যিক মহাকাশযানের সাহায্যে হাবলের কাছে পৌঁছে তার পরিষেবা বা প্রযুক্তিগত উন্নতি করার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তৃতীয় সম্ভাবনা হল, হাবলের বৈজ্ঞানিক কাজ শেষ হলে তাকে নিরাপদে অবসরে পাঠানো। সেক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিতভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করানো অথবা অন্য কোনও নিরাপদ কক্ষপথে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হতে পারে।

তবে এই মুহূর্তে কোনও উদ্ধার অভিযান চূড়ান্ত হয়নি। এগুলি সবই প্রস্তাবিত পরিকল্পনা। NASA-র লক্ষ্য, কোন প্রযুক্তি বাস্তবে ব্যবহার করা সম্ভব এবং কোন পদ্ধতিতে খরচ কম হবে, তা আগে খতিয়ে দেখা।

সংস্থাটির তরফে জানানো হয়েছে, কক্ষপথের উচ্চতা বাড়ানোর কোনও অভিযান করতে হলে ২০৩২ সালের মধ্যেই তা সম্পন্ন করতে হবে। অর্থাৎ পরিকল্পনা তৈরি, প্রযুক্তি প্রস্তুত এবং অভিযান পরিচালনার জন্য হাতে রয়েছে সীমিত সময়। আগ্রহী বেসরকারি সংস্থাগুলি ৩০ নভেম্বর, ২০২৬ পর্যন্ত প্রস্তাব জমা দিতে পারবে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হাবল টেলিস্কোপ?

৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে মহাকাশ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে হাবল। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা বদলে দেওয়া থেকে শুরু করে দূরবর্তী ছায়াপথ, নক্ষত্র এবং গ্রহের পর্যবেক্ষণ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে রয়েছে এই টেলিস্কোপের উল্লেখযোগ্য অবদান।

NASA এবং ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ESA-র যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই প্রকল্পের পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে NASA-র গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার। নতুন প্রজন্মের মহাকাশ টেলিস্কোপ তৈরির কাজ চললেও হাবলের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব এখনও ফুরিয়ে যায়নি।

তাই একটি ঐতিহাসিক মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রকে আরও কিছু বছর সচল রাখা সম্ভব কি না, এখন সেটাই বড় প্রশ্ন। হাবলকে বাঁচানোর এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হয়, সেদিকেই নজর রাখছেন বিশ্বের মহাকাশ বিজ্ঞানীরা।