নয়দিল্লি: এবার নিজস্ব ক্যান্সারের ওষুধ তৈরি করছে ভারত। যে সে ওষুধ নয়, 'স্মার্ট' ক্য়ান্সার ড্রাগ RK-251, যা শরীরে বসে তাকে ওতপেতে। ক্যান্সারের উপস্থিতির জানান পেলেই, সপাটে আঘাত হানে। তবে বেছে বেছে শুধুমাত্র ক্যান্সারের দ্বারা সংক্রমিত কোষগুলিকেই আক্রমণ করে RK-251. ক্যান্সারকে একেবারে সমূলে উপড়ে ফেলে। নয়া ওই ওষুধটি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে এখনও পর্যন্ত। সেটির কার্যকারিতা প্রমাণিত হলে আগামী দিনে আর কেমোথেরাপির প্রয়োজন পড়বে না বলে আশাবাদী ভারতীয় বিজ্ঞানীরা। (Cancer Smar Drug)
ক্যান্সারের নিজস্ব 'স্মার্ট' ওষুধ, RK-251 তৈরির ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি মন্ত্রক। বলা হয়েছে, শরীরে প্রবেশের সময় নিষ্ক্রিয় থাকবে RK-251. সক্রিয় হয়ে উঠবে ক্যান্সারের কোষে প্রবেশের পর। ক্যান্সারে সংক্রমিত কোষের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগানো হয়েছে ওষুধটি তৈরি করতে। ক্যান্সারের কোষে সাধারণত রিয়্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিস বা ROS-এর মাত্রা বেশি থাকে। ROS এমন একটি অণু, যার মাত্রা বেশি হলে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। সেই ফারাককে কাজে লাগিয়েই নতুন ওষুধটি তৈরি করেছেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা, যা ক্যান্সার সংক্রমিত কোষে পৌঁছনোর পরই সক্রিয় হয়। (Cancer Drug RK-251)
আরও পড়ুন: নিজের নামে সর্বাধিক কয়টি সিমকার্ড রাখতে পারবেন? কড়া নির্দেশ কেন্দ্রের, ইচ্ছেমতো কেনা যাবে না
কী ভাবে কাজ করে RK-251?
RK-251 ওষুধটির কার্যকারিতা প্রমাণিত হলে, ক্যান্সারের চিকিৎসা আরও সুনির্দিষ্ট হয়ে উঠবে এবং সুস্থ কোষগুলির ক্ষতি হবে না। শুধুমাত্র ক্যান্সার সংক্রমিত কোষের ভিতর গিয়ে কাজ করে বলেই ওষুধটিকে 'স্মার্ট' বলা হচ্ছে। সব ঠিক থাকলে আগামী দিনে RK-251 কেমোথেরাপির বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। কারণ ক্যান্সারের চিকিৎসায় বর্তমানে যে কেমোথেরাপির প্রচলন রয়েছে, সেটি বেছে বেছে শুধুমাত্র ক্যান্সার সংক্রমিত কোষগুলিকেই আক্রমণ করে না, সুস্থ কোষেরও ক্ষতি করে। ফলে শরীরের কার্যক্ষমতা ভেঙে পড়ে, ভেঙে পড়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হওয়ার আগে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলাকালীন দেখা গিয়েছে, RK-251 ওষুধটি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। বিশেষ করে 'ট্রিপল নেগেটিভ' স্তন ক্যান্সারের কোষের উপর ওষুধটি অত্যন্ত কার্যকর। সেই তুলনায় সুস্থ কোষের উপর ওষুধটির পরিমাণ অতি সামান্য। জেব্রাফিশ অর্থাৎ মিষ্টি জলের অঞ্জু মাছের ভ্রূণের উপর ওষুধটি প্রয়োগ করা হয়েছিল। তাতে কোনও রকম বিষক্রিয়া বা ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায়নি। বরং ROS-এর উপস্থিতি বুঝে আলোক সঙ্কেত দিয়েছে। তাই পরবর্তী পর্যায়ের গবেষণার জন্য ওষুধটি নিরাপদ বলে মনে করছেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা। রোগীদের উপর প্রয়োগের উপর আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে এখনও পর্যন্ত গবেষণায় যে তথ্য উঠে এসেছে, তা ACS-Journal of Medical Chemistry-তে প্রকাশিত হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্র।
কতটা কার্যকর RK-251?
কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি মন্ত্রকের অধীনস্থ স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান, ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডি ইন সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (IASST)-র গবেষক আশিস বালা এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি-গুয়াহাটির গবেষক কেবি ভাবক নেতৃত্বাধীন টিম RK-251 ওষুধটি তৈরি করেছে। ROS-এর মাত্রা বেশি এমন কোষে যখন প্রবেশ করে RK-251, তার অণুগুলি ওষুধটিকে সক্রিয় করে তোলে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধী NBDHEX যৌগ নির্গত হয়। যে প্রোটিনের সাহায্যে ক্যান্সারের কোষ বেঁচে থাকে এবং চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, সরাসরি সেই প্রোটিনকে রুখে দেয় NBDHEX. ক্যান্সার সংক্রমিক কোষের ভিতরই RK-251 ওষুধটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। সাধারণ কোষের ভিতর নিষ্ক্রিয় থাকে সেটি।
সত্যিই কি কেমোথেরাপির বিকল্প?
তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ এখনই RK-251 ওষুধটি কেমোথেরাপির বিকল্প বলতে নারাজ। তাঁদের মতে, মানুষের উপর প্রয়োগে কী হয়, তা দেখতে হবে আগে। তবে তাতে যদি ফল আশানুরূপ হয়, সেক্ষেত্রে কেমোথেরাপির বিকল্প হয়ে উঠতে পারে ওষুধটি। TGH Onco Life Cancer Centre-এর কনসালট্যান্ট ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড রেডিয়েশন অঙ্কোলজিস্ট সিদ্ধেশ ত্রিম্বাকে জানিয়েছেন, এখনও নিশ্চিত ভাবে কিছু বলার মতো সময় আসেনি। তবে গবেষকরা যেভাবে এগোচ্ছেন, তা নিয়ে আশাবাদী তিনিও। তাঁর মতে, ক্যান্সারের জীববিজ্ঞান অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। সাধারণ কোষগুলি অক্ষত থাকবে, এমনটা গ্যারান্টি দিয়ে বলাও কঠিন। তাই আরও গবেষণার প্রয়োজন। ক্যান্সার রোগীদের শরীরে ওষুধ প্রয়োগের পর কী হয়, তা-ই দেখার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে কার্যকারিতা প্রমাণিত হলেও, RK-251 পুরোপুরি ভাবে কেমোথেরাপির বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। কারণ ক্যান্সারের ভিন্ন ভিন্ন ধরন রয়েছে। রোগী বিশেষে রোগের ধরনও ভিন্ন ভিন্ন। একটি মাত্র গবেষণা দ্বারা ওষুধটিকে কেমোথেরাপির বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা যাবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই। তবে ক্লিনিক্যাল রিপোর্টে কী উঠে আসে, এই মুহূর্তে সেদিকেই তাকিয়ে সকলে।
