Bengal Election 2026 : 'সর্বনাশ করে দিয়েছে', 'স্বাস্থ্য' ভাল নেই স্বাস্থ্যের ? ভোট-বাক্সে প্রভাব পড়বে কোচবিহারে ?
Coochbehar News : তৃণমূল কংগ্রেসের মূল ইস্যু SIR। অথচ বিরোধীরা অভিযোগ করছে যে, তৃণমূল কংগ্রেসের জমানায় শিক্ষা-স্বাস্থ্য নষ্ট হয়েছে।

দীপক ঘোষ, কোচবিহার : রাজার শহর কোচবিহার। ভোটের আগে কেমন আছে এই জেলার 'স্বাস্থ্য' ?
কামতাপুর সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল কোচবিহার। ১৭৭২-'৭৩, কামতাপুর আক্রান্ত হয় ভুটান রাজার হাতে। কামতাপুর রাজার অনুরোধে যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৭৭৩ সালে ভুটানকে পরাজিত করে কামতাপুরকে মুক্ত করে ব্রিটিশ বণিকরা। এরপরেই কামতাপুর হয় ব্রিটিশের করদ রাজ্য। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর প্রায় আড়াই বছর স্বাধীন ছিল কোচবিহার। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত ঘরে বাইরে চাপের মুখে ১৯৫০ সালে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এই ভুখণ্ড এবং আত্মপ্রকাশ করে পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা হিসেবে। তারপর থেকেই রাজনৈতিক উথালপাতালের সাক্ষী এই জেলা আজ আবার নতুন এক রাজনৈতিক লড়াইয়ের শরিক। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন , এই জেলার জন্য নতুন করে চাওয়া পাওয়ার হিসেব বুঝে নেওয়ার সময়। যার সঙ্গে পাল্লা দিতেই এখন চূড়ান্ত সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলি। শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস ৯টি কেন্দ্রেই প্রার্থী ঘোষণা করে দেওয়ার পরে জেলা জুড়ে প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তারা।
তৃণমূল কংগ্রেসের মূল ইস্যু SIR। অথচ বিরোধীরা অভিযোগ করছে যে, তৃণমূল কংগ্রেসের জমানায় শিক্ষা-স্বাস্থ্য নষ্ট হয়েছে। রাস্তাঘাটের অবস্থা ভাল নয়। শিক্ষা-স্বাস্থ্যে তো সবথেকে বেশি অভিযোগ করা হয়। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে তৃণমূল কংগ্রেস বলে আমরা ভাতা দিয়েছি। আমরা বিভিন্ন স্কিম দিয়েছি। আবার ওরা বলছে, ওদের বিভিন্ন স্ক্যাম আছে। এই স্কিম-স্ক্যাম, ব্যর্থতার বাইরে বেরিয়ে তৃণমূল শুধু SIR দিয়ে মাত করতে পারবে ?
এবিপি আনন্দর এই প্রশ্নের উত্তের কোচবিহারের দিনহাটার তৃণমূল প্রার্থী ও বিদায়ী উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহ বলেন, "শুধু SIR কেন, SIR একটা ব্যাপার। আমরা কোচবিহারের মানুষ। এটা তো দেখতে হবে, ২০১১ সালের পরে কোচবিহারে একটা বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। যা আমরা কখনো ভাবিনি। আমি তো বলেছি, দিনহাটা হাসপাতালে যে পরিকাঠামো আছে...খুব কম জায়গায়...দিনহাটা শহরের কোনও নার্সিংহোমে এই পরিকাঠামো নেই। মধ্যবিত্তদের একটা মানসিকতা আছে যে, অসুখ হলে নার্সিংহোমে যাব। যে চিকিৎসাটা হয়তো কোচবিহার জেলাতেই হবে, সেটা করার জন্য আমরা হায়দ্রাবাদে উড়ে গেলাম।"
যেটাকে নিজেদের জোরের জায়গা বলে মনে করছে তৃণমূল, সেটাকেই তৃণমূলের প্রধান দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে পাল্টা আক্রমণ নেমেছে বিরোধীরা। লড়াইয়ের মাঠে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মরিয়া বামেরা সরব হয়েছে জেলায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যের পরিবেশ নিয়ে।
কোচবিহার সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক অনন্ত রায় বলেন, "পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার আমরা যখন ক্ষমতায় ছিলাম, আমরা মূলত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলাম। স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রত্যেকটা গ্রামে...প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র আমরা গড়ে তুলেছিলাম। সেখানে গ্রামবাংলার অসংখ্য মায়েরা যারা গর্ভবতী এবং তাঁদের সন্তান প্রস্রবের জন্য সমস্ত হাসপাতালে ব্যবস্থা ছিল। কোথাও ২০ বেডের হাসপাতাল, কোথাও তার থেকেও একটু বেশি। স্বাস্থ্যের একটা পরিকাঠামো গোটা রাজ্যে তৈরি করার একটা উদ্যোগটাকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে করেছিলাম। আজ তৃণমূল গোটা রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একেবারে সর্বনাশ করে দিয়েছে।" Coochbehar Health News
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে, জেলার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অবস্থা কেমন ? পরিষেবা কতটা পাওয়া যায়? এখানে কান পাতলেই শোনা যায়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ। আদৌ কি অভিযোগের কোনও বাস্তব ভিত্তি রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বেরিয়ে পড়ে এবিপি আনন্দ। শহর ছাড়িয়ে কিছুদূর এগিয়ে চোখে পড়ে, একটা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। তুফানগঞ্জের দেওচড়াই প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকেই বলা হয় স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ভিত। কী অবস্থায় রয়েছে জেলার প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ? সেখানে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন এখানে ডাক্তার অনুপস্থিত থাকার পর সদ্য এখানে কাজে যোগ দিতে বলা হয়েছে চিকিৎসককে। সদ্য রোগী দেখতে শুরু করেছেন তিনি। ৬টি বেড রয়েছে। অর্থাৎ, ৬ জনকে ভর্তি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু এই মুহূর্তে সবই বন্ধ (প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহের সময়)। সিস্টারদের বাড়ি তালি মারা। অর্থাৎ, যে পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, সেটাও ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এটাই বাস্তব চিত্র কোচবিহারের প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, "এখানে আগে ২৪ ঘণ্টা পরিষেবা পাওয়া যেত। এখন তো পাওয়াই যায় না। ডাক্তার নেই। কিছুই পাওয়া যায় না। খালি ২ জন নার্স আছেন।" এদিকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জমি দখল করে বাড়ি তৈরির অভিযোগ উঠেছে। এ প্রসঙ্গে কোচবিহারের জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারি জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়টি BMOH-কে বলব খোঁজ নিয়ে দেখতে।
কেন এই পরিস্থিতি? কী বলছেন শহরের অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা? চিকিৎসক অশোক ব্রহ্ম বলেন, "পেরিফেরি লেভেলের চিকিৎসটা প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে। দেখবেন, প্রত্যেক হেল্থ সেন্টারে প্রচুর মানুষ আসছেন। তাঁরা এসে ওষুধ নিয়ে চলেও যাচ্ছেন। কিন্তু, আলটিমেটলি যে চিকিৎসা সেটা হচ্ছে না। তার প্রধান কারণ হচ্ছে, বেশিরভাগে সেন্টারেই ডাক্তার নেই। ফার্মাসিস্টরা চালাচ্ছেন। কোনও জায়গায় হোমিওপ্যাথিক ডাক্তাররা ২টো ইউনিটই চালাচ্ছেন। ডাক্তার নিয়োগ বন্ধ আছে। ডিপার্টমেন্টগুলো একের পর এক খুলে দেওয়া হয়েছে। ঘটা করে খোলা হয়েছে। কিন্তু সেখানে পরিষেবাটা পাওয়া যাচ্ছে না। মূলত ডাক্তারের অভাবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্টাফের অভাবও আছে।"
শুধু প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রই নয়, প্রশ্নচিহ্নের মুখে কোচবিহার মেডিক্যাল কলেজের পরিকাঠামোও। এখানেও সেই একই অভিযোগ--- নেই আর নেই। ডাক্তার নেই, নার্স নেই, টেকনিশিয়ান নেই, ফলে চিকিৎসাটা কী অবস্থায়, সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। মেডিক্যাল কলেজের একটার পর একটা ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ পরিষেবা। এক্কেবারে সহজ, সাধারণ সমস্যা নিয়ে আসা রোগীদেরও ফেরত পাঠাচ্ছে মেডিক্যাল কলেজ, এই অভিযোগ ভূরি ভূরি। তেমনই এক অভিযোগ নিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে কোচবিহার। ছোট্ট এক শিশুর নাকে ঢুকেছিল বেলুনের টুকরো। অভিযোগ, পরিবার বাচ্চাটিকে নিয়ে মেডিক্যাল কলেজে ছুটে গেলে, সেখানে দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে রাখা হয়। তারপর, বেলুনের টুকরো এখানে বের করা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে, পরিবারটিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। কী হয়েছিল সেদিন? ঘটনার কথা নিজে মুখেই জানালেন শহরের উপকণ্ঠে বাঁশদহ গ্রামের বাসিন্দা প্রসেনজিৎ সরকার। West Bengal Election 2026
শুধু প্রসেনজিতের পরিবার নয়। মেডিক্যাল কলেজের সামনে দাঁড়ালে, একই অভিযোগ কানে আসবে আপনার। বিপন্ন স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে একটা জেলা যেখন মেডিক্যাল কলেজকে আঁকড়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, তখন কেন এই স্বপ্নভঙ্গ ? কোচবিহার মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক শুভ্র সমুজ্জ্বল বসু বলেন, "এখানে যেটা জেলা হাসপাতাল ছিল সেটা যখন মেডিক্যাল কলেজে আপগ্রেডেড হয় তখন নানা বাধা-বিপত্তি অসুবিধার মধ্যে দিয়ে গেছে। এখানকার একটা বড় অসুবিধা এখানকার লোকেশন, কোচবিহারের মধ্যে খুব ভাল জায়গাতে। যথেষ্ট সংখ্যক ডাক্তার নেই। সাপোর্ট স্টাফও যথেষ্ট সংখ্যক নেই। অনেক সময় আমাদের তার বাইরে কন্ট্র্যাকচুয়াল স্টাফ দিয়ে চালানো হচ্ছে। ফলে, সার্ভিসের ক্ষেত্রে সেটার একটা প্রভাব পড়তে পারে। জেলা হাসপাতাল বলে যে একটা চাপ ছিল, অর্থাৎ সমস্ত জেলা থেকে রোগীরা এখানে উঠে আসেন তারজন্য তো একটা সমস্যা আছেই। এখন নতুনভাবে পোস্টিং হচ্ছে, কিন্তু পোস্টিং যেটা হচ্ছে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম।"





















