Success Story: দিনমজুরের কাজ করেছেন, স্কুলের ফি দিতে ভাঙতেন পাথর! ৭ বার ব্যর্থ হয়েও UPSC জয়, হার মানাবে সিনেমার গল্পকেও
স্কুলের ফি জোগাতে মায়ের সঙ্গে পাথর ভাঙতেন রাম ভজন কুমার। দিল্লি পুলিশের কনস্টেবল হওয়ার পর ৭ বার UPSC-তে ব্যর্থ হন। অষ্টম প্রচেষ্টায় সফল হয়ে গড়লেন অনুপ্রেরণার ইতিহাস।

কলকাতা: সাফল্যের পথ কখনও সহজ হয় না। কখনও সেই পথ পেরোতে হয় অভাবের সঙ্গে লড়াই করে, কখনও একের পর এক ব্যর্থতার ধাক্কা সামলে। কিন্তু লক্ষ্য যদি স্থির থাকে, তা হলে বারবার হেরেও একদিন জয় আসতে পারে। তারই জ্বলন্ত উদাহরণ রাম ভজন কুমার। একসময় স্কুলের খরচ জোগাতে মায়ের সঙ্গে নির্মাণস্থলে পাথর ভেঙেছেন। পরে দিল্লি পুলিশের কনস্টেবল হয়েছেন। সেখানেই থেমে থাকেননি। সাতবার ব্যর্থ হওয়ার পর অষ্টম প্রচেষ্টায় UPSC Civil Services Examination-এ সফল হয়ে প্রমাণ করেছেন—ব্যর্থতা কখনও শেষ কথা নয়।
অভাবই ছিল ছোটবেলার সঙ্গী
রাজস্থানের বাপি গ্রামের এক অত্যন্ত সাধারণ পরিবারে জন্ম রাম ভজনের। তাঁর বাবা-মা ছিলেন দিনমজুর। কোনও দিন কাজ মিলত, কোনও দিন মিলত না। ফলে সংসারে নিয়মিত আয় বলতে কিছুই ছিল না। উৎসবের সময় আত্মীয়দের নতুন পোশাক পরতে দেখলেও তাঁর পরিবারের কাছে ভাল পোশাক কেনাও ছিল বিলাসিতা।
সরকারি স্কুলেই শুরু হয় পড়াশোনা। অনেক সময় শিক্ষকরা বই দিয়ে সাহায্য করতেন। ছোট থেকেই অভাব তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, জীবনে এগোতে হলে লড়াই ছাড়া অন্য কোনও পথ নেই।
দশম শ্রেণিতে স্কুলে প্রথম হওয়ার পর পরিবারের মানুষ প্রথম বুঝতে পারেন, ছেলের মধ্যে বড় কিছু করার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের দায়িত্বও ছিল তাঁর কাঁধে। বই কেনা ও পরিবারের খরচে সাহায্য করতে মায়ের সঙ্গে নির্মাণস্থলে কাজ শুরু করেন রাম ভজন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাতুড়ি দিয়ে পাথর ভাঙতেন তিনি। কাজ করতে গিয়ে বহুবার আহতও হয়েছেন।
পরে রাম ভজন জানিয়েছিলেন, পাথর ভাঙতে গিয়ে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছিলেন। পাথরের সঠিক জায়গায় আঘাত করতে পারলে সেটি সহজে ভেঙে যায়। জীবনের ক্ষেত্রেও সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি—নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেখানেই সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছিলেন।
কনস্টেবলের চাকরি, তবু চোখে বড় স্বপ্ন
স্নাতক হওয়ার পর দিল্লি পুলিশে কনস্টেবল হিসেবে যোগ দেন রাম ভজন। চাকরির সময় ছিল অনিশ্চিত। কখনও গেটে নিরাপত্তার দায়িত্ব, কখনও কম্পিউটারের কাজ, কখনও সাধারণ মানুষের সমস্যা সামলানো—কঠিন ডিউটির মধ্যেই কাটত দিন।
এই সময়ই তিনি কাছ থেকে দেখেন, একজন প্রশাসনিক আধিকারিক কীভাবে সাধারণ মানুষের সমস্যার সমাধান করতে পারেন। তখনই তাঁর মনে জন্ম নেয় নতুন স্বপ্ন—তাঁকেও অফিসার হতে হবে। এরপর শুরু হয় UPSC-র প্রস্তুতি।
ধার করে কোচিং, প্রথম প্রচেষ্টাতেই ব্যর্থতা
২০১৫ সালে শুরু হয় রাম ভজনের UPSC-যাত্রা। কোচিংয়ের খরচ জোগাতে তাঁকে টাকা ধার করতে হয়েছিল। একদিকে পুলিশের কঠিন ডিউটি, অন্যদিকে স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব—সব সামলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। আচমকা ডিউটির ডাক এলে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসও বাদ পড়ত।
প্রথমবার কয়েক নম্বরের জন্য আটকে যান। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালেও সাফল্য এল না। বারবার ব্যর্থ হয়ে অনেক সময় তাঁরও মনে হয়েছিল, আর চেষ্টা করে কী লাভ?
কিন্তু নিজেকেই একটি প্রশ্ন করতেন রাম ভজন—এখন থেমে গেলে অফিসার হওয়ার স্বপ্ন চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। আর যদি সফল হন, তা হলে বদলে যেতে পারে তাঁর গোটা জীবন।
একবার নয়, দু’বার নয়—সাতবার ব্যর্থ
২০১৮ সালে UPSC Mains পর্যন্ত পৌঁছেও চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা হয়নি। ২০১৯ সালে মূল পরীক্ষার ধাপ পার করলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় CSAT। নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করে আবার প্রস্তুতি শুরু করেন। কিন্তু ২০২০ সালেও সাফল্য অধরা থেকে যায়।
এরপর ২০২১ সালে জীবনে নেমে আসে আরও বড় আঘাত। বাবাকে হারান রাম ভজন। এই মৃত্যু তাঁকে ভিতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। একসময় মনে হয়েছিল, এত লড়াইয়ের কোনও অর্থই নেই।
কিন্তু সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আবার উঠে দাঁড়ান তিনি। সমস্ত দুঃখ ও ব্যর্থতাকে শক্তিতে পরিণত করে শেষবারের মতো সর্বশক্তি দিয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
অষ্টম প্রচেষ্টায় এল বহু প্রতীক্ষিত জয়
অষ্টমবার আর কোনও ভুল রাখতে চাননি রাম ভজন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাতে উত্তর লেখার অনুশীলন করেছেন। সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতির জন্য মক ইন্টারভিউ দিয়েছেন। আত্মবিশ্বাস বাড়াতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার অভ্যাসও করেছেন।
অবশেষে এল সেই দিন। UPSC Civil Services Examination 2022-এ সফল হন রাম ভজন কুমার। দীর্ঘ আট বছরের লড়াই, সাতটি ব্যর্থতা, অভাব, কঠিন পুলিশ ডিউটি এবং বাবাকে হারানোর যন্ত্রণা—সবকিছুকে পিছনে ফেলে নিজের স্বপ্ন পূরণ করেন তিনি।
একসময় যে হাত স্কুলের খরচ জোগাতে পাথর ভাঙত, সেই মানুষই শেষ পর্যন্ত দেশের অন্যতম কঠিন পরীক্ষায় সফল হন।
রাম ভজনের জীবন মনে করিয়ে দেয়, ব্যর্থতার সংখ্যা দিয়ে কোনও মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় না। সাতবার ব্যর্থ হওয়ার পরও যদি অষ্টমবার চেষ্টা করার সাহস থাকে, তা হলে অসম্ভব বলে হয়তো সত্যিই কিছু থাকে না।
তাঁর বার্তা একটাই—নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি কি সত্যিই নিজের ১০০ শতাংশ দিয়েছেন? যদি না দিয়ে থাকেন, আরও একবার চেষ্টা করুন। কারণ সাফল্য না এলেও অন্তত এই আফসোস থাকবে না যে, আপনি নিজের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেননি।
Education Loan Information:
Calculate Education Loan EMI























