এক্সপ্লোর
৮০-তে আসিও না

....ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিং ছিল ঠিকই, কিন্তু মোমবাতি, হারিকেন আর লন্ঠনের আলোও ছিল- বিস্তারিত পড়ুন
Source : নিজস্ব ছবি
সুমন দে
হুজুগ আর কাকে বলে !
না এ জীবনে পাকা চুল আর কাঁচা হবে, না রক্তচাপের ওষুধ ছাড়া যাবে, তবু অতীতে ফেরার কি প্রাণান্তকর চেষ্টা মানুষের! এআইকে বললেই রংবাহারি সাবেকি জামাপ্যান্টে সাজিয়ে দিচ্ছে নিখুঁত স্টাইলে। একেবারে গত শতকের আশির দশকের ঢঙে--‘শুটিং-শাটিং‘ কোম্পানির ঠিক যে ধরনের বিজ্ঞাপন আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকীর পেছনের পাতায় দেখা যেত, হুবহু যেন তাই! কাজেই এমন ভার্চুয়াল আই-ক্যান্ডির লোভ সংবরণ করা যে মুশকিল এটাও সহজেই অনুমেয়। তাই সমাজমাধ্যমের পাতা ভরে উঠছে ছবিতে, আর সেই ছবিগুলো যেন চিৎকার করে বলছে- ৮০-তে আসিও, বারবার আসিও, কল্পনায় আসিও, রঙিন ডানা লাগাইয়া আসিও...
আচ্ছা, এবার একবার ফ্ল্যাশব্যাক-এর ডানা লাগিয়ে অতীতে যাই, একবার মনে করে দেখি, কেমন ছিল আমাদের ছোটবেলার সেই ৮-এর দশক। সে দশকের একেবারে শুরুতে আমার স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়নি। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পাওয়া ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুপারহিট বাংলা ছবির কারণে ‘আশি‘ বললেই যে বুড়োটে ভাবটা মনে ভেসে ওঠে, এক নাবালকের জীবনে কিন্তু তার কোন অস্তিত্ব ছিল না। যুগটা ডিজিটাল ছিল না বটে, কিন্তু মনে করুন, সস্তা ডেটার দয়া-দাক্ষিণ্য ছাড়াই রীতিমতো রঙে ঝলমল করত আমাদের ছোটবেলা।
ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিং ছিল ঠিকই, কিন্তু মোমবাতি, হারিকেন আর লন্ঠনের আলোও ছিল। ছিল বিদ্যুৎ সংযোগ ফেরত আসার মুহূর্তে গোটা পাড়াজুড়ে একসঙ্গে সেই হই-হই কলরব। এসি ছিল না বটে, কিন্তু এসির অভাববোধও তো ছিল না। মোবাইল ফোন, এস এম এস, ইমেল কিছু ছিল না, কিন্তু স্বমহিমায় ছিল আবেগের রকমারি ঢেউ-মাখা পোস্টকার্ড, ইনল্যান্ড লেটার আর নীল রঙের এয়ারমেল। পোস্টম্যানকাকুর অপেক্ষায় থাকা সবুজ রঙের লেটারবক্সটা দিনের মধ্যে কতবার যে খোলা হত আর প্রতিবার ওই লেটারবক্সের পেছনে লুকিয়ে থাকা টিকটিকিটা দুদ্দার করে সাময়িকভাবে অদৃশ্য হত- তারই ইয়ত্তা নেই। পাড়ার রকে আড্ডার বয়স তখনও হয়নি বটে, কিন্তু তখনই ফুটবল মাঠগুলোতে রাতারাতি বাড়ি হয়ে যাচ্ছিল আর ক্রিকেট বা ফুটবল খেলার জায়গা বলতে পড়ে ছিল কংক্রিটে বাঁধানো রাস্তা।
মনের যে রাস্তা দিয়ে ঠিক-ভুল আর ন্যায়-অন্যায়ের বিচারবোধ তৈরি হয় সেই রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন অরণ্যদেব আর ফেলুদা। সবচেয়ে মহার্ঘ্য কিন্তু বিরল উপহার ছিল দু‘টাকার ইন্দ্রজাল কমিকস- প্রত্যেকটা বইয়ের স্টলে নারকেল দড়িতে পরপর ঝোলানো থাকত সাম্প্রতিক সংখ্যাগুলো। সত্যজিৎ রায় তখন নিয়মিত তাঁর রেখায় আর লেখায় গোটা ছোটবেলাটা ভরিয়ে দিচ্ছেন। একদিকে সন্দেশের সম্পাদনা আর অলংকরণ, তো অন্যদিকে আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকীতে শঙ্কু-কাহিনী। দেশ-এ থাকত ফেলুদার উপন্যাস, তবে দেশ পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে পড়ার অনুমতি ছিল শুধু ফেলুদাটুকুই।
আর ছিল সাদা-কালো টেলিভিশন, কিন্তু তার সে কী রঙ! কল্পনার রঙ, চেতনার রঙ, বিনোদনের রঙ - সবকিছু মিলেমিশে যেত ছোট্ট বাক্সটায়! অনিয়মিত সিগন্যালে প্রতি সন্ধেবেলায় ঝিরঝির করা ছবি, কাঁপতে থাকা প্রতিবিম্ব। ছবির দৃশ্যময়তা ফেরাতে কখনও দুপাশে শাটার দেওয়া টেলিভিশন সেটের মাথায় চাপড় মারা, কখনও ছাদে উঠে অ্যালুমিনিয়ামের অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে টিভি সিগন্যাল ঠিক করার প্রাণান্তকর চেষ্টা- সে এক অভিযান ছিল বটে। সপ্তাহভর সবুরের মেওয়া ফলতো রবিবার সকালে । সাড়ে নটায় স্পাইডারম্যান, সাড়ে দশটায় হি-ম্যান আর এগারোটায় বিক্রম-বেতাল। তবে রবিবারগুলো সম্পূর্ণ পাল্টে গেল ১৯৮৭ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে ... শুরু হল সকাল ন'টায় রামানন্দ সাগরের ‘রামায়ণ‘। বাকিটা ইতিহাস।
আবেগের তো ইতিহাস হয় না, অভিধানও নেই। তাই আশির দশকের স্মৃতিমেদুর নস্টালজিয়া অন্তহীন। তাই শব্দে তাকে ধরতে চাইলে সে লেখাও চলতেই থাকবে। তাই আপাতত দাড়ি টানছি একটা ছবি দিয়ে। এ ছবিতে কোথাও এআই কামড় বসায়নি। এ ছবি অ্যানথ্রোপিক থেকে জ্যাকব ককসনের ইস্তফা দেওয়ার পাক্কা ৪৬ বছর আগের- একেবারে আগমার্কা আশির দশকের শুরুর এ ছবি। আরোপিত সিপিয়াটোন নয়, এই ছবির রঙ হলুদ হয়েছে সময়ের ধুলো পড়ে।

অতএব এআই ছাড়াই, আমিও আশিতে আসিলাম।
View More
Advertisement
ট্রেন্ডিং
Advertisement
Advertisement
সেরা শিরোনাম
খবর
জ্যোতিষ
ক্রিকেট
ব্যবসা-বাণিজ্যের






















