Makar Sankranti Tusu Utsav : মকর সংক্রান্তিতেই শেষ টুসু উৎসব, কীভাবে রাঢ় বাংলার সংস্কৃতিতে জড়িয়ে গেল টুসু?
মেয়েরা একসঙ্গে গান গাইতে গাইতে টুসু দেবীকে বাঁশ বা কাঠের তৈরি রঙিন কাগজে সজ্জিত দোলায় বসিয়ে নদী বা পুকুরে গিয়ে বিসর্জন দেয়।

পূর্ণেন্দু সিংহ, বাঁকুড়া : রাঢ় বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে টুসু গানের ইতিহাস। রাঢ়ের মানুষের রুক্ষ জীবনের সুখ দু:খ হাসি কান্না মিলন বিরহের গাথা হাজার হাজার বছর ধরে গেঁথে রয়েছে এই টুসু গানের মধ্যে। কিন্তু মোবাইল ফোন আর টেলিভিশনের এই জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই টুসু সংস্কৃতির আজ বড় দুর্দিন। নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয়তা হারিয়ে চিরতরে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে টুসু গান। আক্ষেপের সুর পুরানো প্রজন্মের গলায়।
আজ থেকে কয়েক দশক আগেও পৌষের সন্ধ্যায় রাঢ় বাংলার গ্রাম গঞ্জে কান পাতলে ভেসে আসত মাটির গন্ধ মাখা টুসু গানের সুর। অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে ইতু বিসর্জন দিয়ে মাটির তৈরি নতুন খোলায় ধানের তুষ ও গাঁদা ফুল দিয়ে সাজিয়ে তৈরি করা হত টুসু খোলা। পৌষ মাস জুড়ে প্রতি সন্ধ্যায় সেই টুসু খোলাই হয়ে উঠত পরিবারের আট থেকে আশি সকল বয়সের মহিলাদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। বাড়ির নিকানো মাটির উঠোনে সেই খোলাকে ঘিরে বসে একসঙ্গে গাওয়া হত বিশেষ একধরনের গান। টুসু এক লৌকিক দেবী যাকে কুমারী হিসেবে কল্পনা করা হয় । তাই প্রধানত কুমারী মেয়েরা টুসুপুজোর মূল ব্রতী । টুসু বিসর্জন হয় পৌষ সংক্রান্তির ভোরবেলায়। মেয়েরা একসঙ্গে গান গাইতে গাইতে টুসু দেবীকে বাঁশ বা কাঠের তৈরি রঙিন কাগজে সজ্জিত দোলায় বসিয়ে নদী বা পুকুরে গিয়ে বিসর্জন দেয়। টুসুর প্রচলন রয়েছে পুরুলিয়া ,ঝাড়গ্রাম ,বাঁকুড়া , পশ্চিম মেদিনীপুর এবং পূর্ব সিংভূম জেলায় ।
টুসু গানের ছত্রে ছত্রে জড়িয়ে থাকত সাধারণ মানুষের জীবনের হাসি কান্না সুখ দু:খ বিরহ যন্ত্রণার প্রতিফলন। একসময় এই টুসু গানকে সঙ্গে করেই গড়ে উঠেছিল তৎকালীন মানভূম বর্তমানের পুরুলিয়ার বঙ্গভুক্তির আন্দোলন। মানভূমে বাংলা ভাষা আন্দোলন ১৯১২ সালে শুরু হয়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে ভাষা আন্দোলন তীব্র ভাবে ছড়িয়ে পড়ে মানভূমের বাঙালিদের মধ্যে। সেই আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িয়ে টুসু গান।
গত ২ দশকে বহু ঐতিহ্যবাহী সেই টুসু সংস্কৃতিতে দেখা দিয়েছে ভাটির টান। নতুন ধারার বিনোদনের স্রোতে গা ভাসিয়ে থাকতে ভালবাসে এ অঞ্চলের বর্তমান প্রজন্ম। তাদের কাছে ধীরে ধীরে মলিন হয়ে পড়েছে টুসু গানের ঐতিহ্য ও পরম্পরা। পুরনো প্রজন্মের মহিলারা কোথাও কোথাও টুসু গানের চর্চা ধরে রাখলেও নতুন প্রজন্ম তার প্রতি আগ্রহ হারানোয় আক্ষেপের সুর পুরানোদের গলায়।






















