ক্যালকুলেটরকে হার মানায় মস্তিষ্কের হিসাব! ১৬ বছরেই ৯টি গিনেস রেকর্ড, বিস্ময় বালক ভারতের আরিয়ান
ক্যালকুলেটর ছাড়াই চোখের পলকে কঠিন অঙ্ক! মাত্র ১৬ বছরেই ৯টি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড, ভারতের 'হিউম্যান ক্যালকুলেটর' আরিয়ান শুক্লা

কলকাতা: ক্যালকুলেটরের বোতাম টিপতে হয় না। খাতা-কলমেরও প্রয়োজন পড়ে না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মাথার ভিতর হিসাব কষে ফেলে কঠিন থেকে কঠিনতম অঙ্কের সমাধান! বয়স মাত্র ১৬ বছর। অথচ এই বয়সেই ঝুলিতে রয়েছে ৯টি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড এবং দু'বার মেন্টাল ক্যালকুলেশন ওয়ার্ল্ড কাপ জয়ের শিরোপা। ভারতের এই বিস্ময় কিশোরের নাম আরিয়ান শুক্লা। মহারাষ্ট্রের নাসিকের বাসিন্দা আরিয়ান এখন পরিচিত 'হিউম্যান ক্যালকুলেটর' নামে। তাঁর অসাধারণ গণনাশক্তি তাক লাগিয়েছে গোটা বিশ্বকে।
মাত্র ৬ বছর বয়সে শুরু অঙ্কের সঙ্গে বন্ধুত্ব
আরিয়ানের এই অসাধারণ প্রতিভার শুরু কিন্তু ছোটবেলাতেই। মাত্র ছয় বছর বয়সে মানসিক গণনা বা মেন্টাল ম্যাথমেটিক্সের চর্চা শুরু করে সে। কোনও ক্যালকুলেটর কিংবা খাতা-কলম ছাড়াই মনে মনে অঙ্ক কষার প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। প্রথম দিকে বিষয়টি ছিল নিছক কৌতূহল। কিন্তু বছর দেড়েকের মধ্যেই ছেলের অস্বাভাবিক গণনাশক্তি নজরে আসে বাবা-মায়ের।
এরপর আরিয়ানের প্রতিভাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। ছোট থেকেই নিয়মিত অনুশীলন শুরু হয়। ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে থাকে সে। ২০১৮ সালে মাত্র আট বছর বয়সে তুরস্কের ইস্তানবুলে আয়োজিত মেমোরিয়াড তুরস্ক ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে আরিয়ান। সেখান থেকে সাতটি সোনা, একটি রুপো এবং দুটি ব্রোঞ্জ-সহ মোট ১০টি পদক জিতে দেশে ফেরে সে। সেই প্রতিযোগিতায় শিশুদের বিভাগে দুটি বিশ্বরেকর্ডও গড়েছিল।
১২ বছর বয়সেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন
আরিয়ানের কেরিয়ারে বড় সাফল্য আসে ২০২২ সালে। জার্মানির প্যাডারবোর্নে আয়োজিত মেন্টাল ক্যালকুলেশন ওয়ার্ল্ড কাপে মাত্র ১২ বছর বয়সে চ্যাম্পিয়ন হয় সে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রতিযোগীদের পিছনে ফেলে সেরার শিরোপা ছিনিয়ে নেয় এই ভারতীয় কিশোর।
সেখানেই থেমে থাকেনি আরিয়ান। ২০২৪ সালে ফের একই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজের সেরার জায়গা ধরে রাখে। শুধু তাই নয়, প্রতিযোগিতার ছয়টি বিভাগেই ট্রফি জেতে সে। যোগ, গুণ, বর্গমূল নির্ণয় থেকে ক্যালেন্ডারের তারিখ সংক্রান্ত হিসাব—বিভিন্ন ধরনের মানসিক গণনায় নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেয় আরিয়ান।
কীভাবে এল ৯টি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড?
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইতালির একটি টেলিভিশন শো 'লো শো দেই রেকর্ড'-এ অংশ নিয়ে প্রথম গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়ে আরিয়ান। সেখানে মাত্র ২৫.১৯ সেকেন্ডে মনে মনে ৫০টি পাঁচ অঙ্কের সংখ্যা যোগ করে দেখায় সে। এরপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দুবাইয়ে একদিনেই ছ'টি নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়ে নজির তৈরি করে। তার রেকর্ডের তালিকায় রয়েছে মাত্র ১৮.৭১ সেকেন্ডে ৫০টি পাঁচ অঙ্কের সংখ্যা যোগ করা। এছাড়া ৩০.৯ সেকেন্ডে ১০০টি চার অঙ্কের সংখ্যা এবং ১ মিনিট ৯.৬৮ সেকেন্ডে ২০০টি চার অঙ্কের সংখ্যা যোগ করার রেকর্ডও রয়েছে তার দখলে।
এমনকী, ২০ অঙ্কের একটি সংখ্যাকে ১০ অঙ্কের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা এবং বড় সংখ্যার গুণ করার মতো জটিল হিসাবও মাথার মধ্যে করে ফেলতে পারে আরিয়ান।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ইতালিতে আরও দুটি গিনেস রেকর্ড গড়ে সে। মাত্র ৭১.২২ সেকেন্ডে ১০টি আট অঙ্কের সংখ্যার বর্গমূল নির্ণয় করে। পাশাপাশি ২৮.৮১ সেকেন্ডে ১০টি ১০ অঙ্কের সংখ্যাকে পাঁচ অঙ্কের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করার নজিরও গড়ে।
এভাবেই একের পর এক অসাধ্যসাধন করে মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ন'টি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের মালিক হয়েছে আরিয়ান।
পড়াশোনা, প্রতিযোগিতা, সবেতেই সমান দক্ষ
এত সাফল্যের মাঝেও পড়াশোনায় কোনও খামতি রাখেনি আরিয়ান। বর্তমানে নাসিকের দিল্লি পাবলিক স্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্র সে। দশম শ্রেণির পরীক্ষায় পেয়েছিল ৯৭ শতাংশ নম্বর। গণিতের পাশাপাশি পদার্থবিদ্যার প্রতিও বিশেষ আগ্রহ রয়েছে তার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তির নানা বিষয় নিয়েও কৌতূহল রয়েছে এই কিশোরের। প্রতিযোগিতার মঞ্চে নামার আগে নার্ভাস লাগে আরিয়ানেরও। কিন্তু নিয়মিত অনুশীলন এবং নিজের উপর বিশ্বাসই তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। প্রতিদিনের রুটিনে রয়েছে কয়েক ঘণ্টা অঙ্কের চর্চা। পাশাপাশি মনোযোগ ধরে রাখতে যোগব্যায়ামও করে সে।
নিজের প্রতিভা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চায় আরিয়ান
শুধু নিজের রেকর্ড গড়াই এখন আরিয়ানের একমাত্র লক্ষ্য নয়। ছোটদের মধ্যে গণিতের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতেও উদ্যোগী সে। গ্লোবাল মেন্টাল ক্যালকুলেটরস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা বোর্ড সদস্য হিসেবেও যুক্ত রয়েছে আরিয়ান। শিশুদের জন্য মানসিক গণনার প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচি পরিচালনা করেছে সে। অঙ্ককে ভয় না পেয়ে কীভাবে আনন্দের সঙ্গে কঠিন হিসাব করা যায়, সেটাই অন্যদের শেখাতে চায় এই কিশোর।
আরিয়ানের বাবা নীতিন শুক্লার মতে, সন্তানের উপর নিজের স্বপ্ন বা প্রত্যাশা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয় বাবা-মায়ের। বরং যে বিষয়ে সন্তানের আগ্রহ রয়েছে, সেখানে তাকে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। আরিয়ানের ক্ষেত্রেও তাঁরা সেটাই করেছেন। ছেলের প্রতিভা বুঝতে পেরে তাকে সময় দিয়েছেন, অনুশীলনের সুযোগ করে দিয়েছেন।
মাত্র ছয় বছর বয়সে যে যাত্রার শুরু, আজ তা পৌঁছে গিয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মঞ্চে। ১৬ বছর বয়সেই ন'টি গিনেস রেকর্ড, দু'বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার নজির—সব মিলিয়ে আরিয়ান শুক্লার গল্প শুধু অসাধারণ গণনাশক্তির নয়, বরং আগ্রহ, অধ্যবসায় এবং সঠিক পারিবারিক সমর্থনেরও এক অনন্য উদাহরণ।
Before You Go
Hamidul Rahman News | 'গুন্ডা, মাফিয়া, বিধায়কের বিরুদ্ধে কেস রিওপেন করবেন', হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর






















