Weather : দ্রুত গরম হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগর! এই বর্ষাতেই ভারতে বড় বিপদ? প্রকৃতি দেখাবে চূড়ান্ত কিছু? জুলাইয়েই বড় শঙ্কা?
El Nino Impact On India: প্রশান্ত মহাসাগরের Nino 3.4 অঞ্চল গত বছরের তুলনায় ১.৬৪ ডিগ্রি বেশি উষ্ণ। জুলাইয়ে কম বৃষ্টি হলে ভারতের কৃষি, জলাধার ও খাদ্যের দামে কী প্রভাব পড়তে পারে জানুন

নয়াদিল্লি : শিয়রে এল নিনো। প্রশান্ত মহাসাগরের জল দ্রুত গরম হচ্ছে। আর এই পরিবর্তন ভারতের জন্য তৈরি করতে পারে বড় উদ্বেগ। কারণ, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু অঞ্চল মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বাড়াকমার একটি বৈশ্বিক প্রভাব আছে। গত বছরের এই সময়েই প্রশান্ত মহাসাগরের জলের তাপমাত্রা এই বছরের থেকে ছিল অনেকটাই কম। এ বছর আশঙ্কা সত্যি করেই, শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনোর প্রভাব। আর তার সরাসরি ধাক্কা পড়তে পারে ভারতের বর্ষা, কৃষি, জলাধার এবং পানীয় জলের সরবরাহে।
আমেরিকার ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা NOAA-র দৈনিক সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার তথ্য অনুযায়ী, এল নিনো ও লা নিনা পর্যবেক্ষণের জন্য বিজ্ঞানীরা যে Nino 3.4 অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দেন, সেখানে ২০২৬ সালে উল্লেখযোগ্য উষ্ণতা ধরা পড়েছে। ১ জুন থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত প্রতিটি দিনেই এই অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২০২৫ সালের তুলনায় বেশি ছিল। ৪ জুলাই নাগাদ দুই বছরের তাপমাত্রার ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৬৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর এখানেই ভারতের জন্য বাড়ছে উদ্বেগ। গত বছরের তুলনায় ১.৬৪ ডিগ্রি বেশি উষ্ণ সমুদ্রের জল। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুন Nino 3.4 অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ২৮.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ৪ জুলাই তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২৯.২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে ঠিক উল্টো ছবি দেখা গিয়েছিল। ইন্ডিয়া টুডে-তে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, ওই বছরের ১ জুন তাপমাত্রা ছিল প্রায় ২৭.৮৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ৪ জুলাই তা কমে হয়েছিল ২৭.৫৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ, ২০২৬ সালের ৪ জুলাই মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলটি গত বছরের একই দিনের তুলনায় প্রায় ১.৬৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ। শুধু তাই নয়, ১ জুন দুই বছরের তাপমাত্রার ব্যবধান ছিল ১.০৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ৪ জুলাই তা বেড়ে ১.৬৪ ডিগ্রিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, প্রায় এক মাসে এই ব্যবধান প্রায় ৫৫ শতাংশ বেড়েছে।
ভারতের জন্য কেন চিন্তার এল নিনো?
ভারতের বর্ষার সঙ্গে এল নিনোর সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের জল অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠলে তাকে এল নিনো বলা হয়। এই পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ এবং বৃষ্টির ধরনে প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে শক্তিশালী এল নিনো অনেক সময় দুর্বল দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর ঝুঁকি বাড়ায়। এর ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি, দীর্ঘ ‘ব্রেক মনসুন’, অসম বৃষ্টিবণ্টন এবং অতিরিক্ত গরমের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তবে এল নিনো একমাত্র নিয়ামক নয়। ভারত মহাসাগরের ডাইপোল বা IOD, ম্যাডেন-জুলিয়ান অসিলেশন এবং বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে তৈরি হওয়া নিম্নচাপও ভারতের বর্ষার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জুনেই বড় ধাক্কা, বৃষ্টি কম প্রায় ৪০ শতাংশ
ভারতে ইতিমধ্যেই দুর্বল বর্ষার প্রভাব স্পষ্ট। ২০২৬ সালের জুন মাসে দেশে বৃষ্টি স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩৯.৮ শতাংশ কম হয়েছে। ১৯০১ সাল থেকে হিসাব করলে এটি ভারতের পঞ্চম শুষ্কতম জুন। জুন মাসে স্বাভাবিকভাবে যেখানে প্রায় ১৬৫.৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ার কথা, সেখানে ২০২৬ সালে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৯৯.৫ মিলিমিটার। কেরলে বর্ষা দেরিতে প্রবেশ করার পাশাপাশি দেশের একাধিক অঞ্চলে মৌসুমি বায়ুর অগ্রগতি থমকে গিয়েছিল। ফলে মধ্য, পূর্ব এবং উত্তর ভারতের বহু এলাকায় বৃষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
জুলাইতেও কি কম বৃষ্টি হবে?
জুলাই মাস ভারতের বর্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চার মাসের বর্ষাকালের একটি বড় অংশের বৃষ্টি এই মাসেই হয়। একই সঙ্গে ধান, ভুট্টা, তুলো, সয়াবিন-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খরিফ ফসলের বীজ বোনার প্রধান সময় জুলাই। IMD-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুলাইয়ে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হতে পারে। যদিও গত কয়েকদিনে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে উত্তাল রূপ দেখিয়েছে প্রকৃতি। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনাটাও এলনিনোরই ফল। অতিবৃষ্টি, অনাবৃৃষ্টি, অসময়ে বৃষ্টি, খরা, সব মিলিয়ে প্রকৃতির রুদ্ররূপ দেখা যাবে। সারা দেশের বৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদি গড় বা LPA-র ৯৪ শতাংশের নিচে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। জুলাইয়ের শুরুতে কিছু অঞ্চলে বিস্তৃত বৃষ্টির পর্ব দেখা গেলেও গোটা মাসের সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক থাকতে পারে।
কৃষিতে কতটা প্রভাব পড়তে পারে?
ভারতের বার্ষিক বৃষ্টির প্রায় ৭০ শতাংশ আসে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর হাত ধরে। দেশের কৃষি, জলাধার এবং পানীয় জলের সরবরাহ এই বর্ষার উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ভারতের প্রায় অর্ধেক কৃষিজমিতে পর্যাপ্ত সেচব্যবস্থা নেই। ফলে সময়মতো বৃষ্টি না হলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন কৃষকেরা। দুর্বল বৃষ্টির কারণে খরিফ ফসলের বীজ বোনার কাজে দেরি হতে পারে। বিশেষ করে ধান, ভুট্টা, তুলো এবং সয়াবিনের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে কৃষকদের বীজ বোনার সময় পিছিয়ে দিতে হতে পারে। আবার অনেক জায়গায় কম জল প্রয়োজন এমন ফসলের দিকে ঝুঁকতে হতে পারে।
চাল-ডাল-সবজির দামে প্রভাব পড়বে?
বর্ষার ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফসলের উৎপাদন কমলে তার প্রভাব খাদ্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে।বিশেষ করে চাল, ডাল, ভোজ্য তেল এবং সবজির সরবরাহে চাপ তৈরি হলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তবে পরিস্থিতি কতটা গুরুতর হবে, তা নির্ভর করবে জুলাই ও অগাস্টে বৃষ্টির পরিমাণ এবং বণ্টনের উপর। দেশের এক অংশে অতিবৃষ্টি এবং অন্য অংশে বৃষ্টির ঘাটতিও কৃষির জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
জলাধার এবং পানীয় জল নিয়েও চিন্তা
বর্ষার জল ভারতের বড় বড় জলাধার, নদী এবং ভূগর্ভস্থ জলের ভাণ্ডার পূরণ করে। পরপর কয়েক মাস কম বৃষ্টি হলে জলাধারে জলের পরিমাণ কমে যেতে পারে। এর প্রভাব শুধু কৃষিতে নয়, শহর ও গ্রামীণ এলাকার পানীয় জল সরবরাহের উপরও পড়তে পারে। একই সঙ্গে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাড়তে পারে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি
দুর্বল বর্ষা মানেই শুধু কম বৃষ্টি নয়। মেঘ এবং বৃষ্টির অভাবে অনেক অঞ্চলে দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে।
কেন্দ্রের কনটিনজেন্সি প্ল্যান
দুর্বল বর্ষার আশঙ্কায় ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু করেছে কেন্দ্র। বৃষ্টির ঘাটতিতে ঝুঁকিপূর্ণ ৩০০-র বেশি জেলার জন্য কনটিনজেন্সি প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। যেসব অঞ্চলে সেচব্যবস্থা দুর্বল, সেখানে পরিস্থিতির উপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েক সপ্তাহ
জুলাই এবং অগাস্টের বৃষ্টি ভারতের জন্য এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই দুই মাসের বৃষ্টিই নির্ধারণ করতে পারে খরিফ ফসলের ভবিষ্যৎ, জলাধারের পরিস্থিতি এবং আগামী কয়েক মাসে খাদ্যপণ্যের দামের গতিপ্রকৃতি। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা যদি আরও বাড়ে এবং এল নিনো শক্তিশালী হয়, তা হলে ভারতের বর্ষার উপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তবে IOD, নিম্নচাপ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক আবহাওয়া ব্যবস্থা পরিস্থিতি কিছুটা বদলে দিতে পারে।
তাই শুধু সারা দেশে মোট কত বৃষ্টি হল, তা নয়—কোথায়, কখন এবং কতটা বৃষ্টি হচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।























